কান্নারত এক শিক্ষার্থী। ছবি : সংগৃহীত
ভাস্কর দত্ত:
তারেক রহমানের সরকারের সময়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির চিত্রে দেখা দিয়েছে উল্টো সমীকরণ। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও এবার ভর্তিযোগ্য আসনের তুলনায় পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। ফলে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অথচ দেশের ৫৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেগুলোর অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউট মিলিয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসন রয়েছে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। অর্থাৎ পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও চার লাখের বেশি আসন ফাঁকা থাকবে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টিতে একাডেমিক কার্যক্রম চালু আছে। বাকি সাতটিতে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আসন ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আসন মাত্র ৬৩ হাজার ৬৬৫টি। বাকি বড় অংশ বিভিন্ন অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটের।
অন্যদিকে, দেশের ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আসন প্রায় ১৪ লাখ ৯২ হাজার। বিপরীতে পাস করা শিক্ষার্থী মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন।
এই পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষায় আসনসংকটের পরিবর্তে শিক্ষার্থীসংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর প্রভাব পড়তে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক আসন পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অবশ্য বলছেন, উচ্চশিক্ষায় আসনসংকট হবে না। ফল প্রকাশের দিন গত শনিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পাস করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় আসন অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব নীতিমালা ও মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পাবে। তবে আসন বেশি থাকলেই সব শিক্ষার্থী পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভর্তির যোগ্যতা ও শর্ত আলাদা।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি ফলাফলের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এবারের ফলাফলে পাসের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন।
ফলাফলের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছরের তুলনায় শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে এ পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার চিন্তা করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা বা পুনর্গঠনের বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
এদিকে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থীর জন্য এক মাসের মধ্যে বিশেষ পরীক্ষার আয়োজনের পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিযোগ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে। ফলে আসন ফাঁকা থাকার হিসাবেও পরিবর্তন আসবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আসনসংখ্যা ও পাস করা শিক্ষার্থীর হিসাব দিয়ে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। কারণ সব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান না। অনেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ, কারিগরি শিক্ষা, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মজীবনে প্রবেশের পথ বেছে নেন।
আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসে আসন সীমিত থাকায় সেখানে প্রতিযোগিতা আগের মতোই থাকতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যও বড় বিষয়।
এ অবস্থায় ভর্তি যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ছেড়ে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ার এই পরিস্থিতি উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা, আসন বণ্টন, শিক্ষার মান এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।