আইনজীবীর পরামর্শে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় জামিন নিতে আদালতে হাজির হয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। বুধবার তাঁর জামিন…
আজ ৫ নভেম্বর, উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা, প্রখ্যাত আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সমাজসংস্কারক দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭০ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দেশপ্রেম, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য তিনি ইতিহাসে ‘দেশবন্ধু’ নামে পরিচিত হয়ে আছেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম, আইন পেশায় সাফল্য, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব এবং সামাজিক সংস্কারে অবদানের কারণে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান রয়েছে তাঁর। রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, নারী অধিকার ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক শিকড়ের সম্পর্ক থাকায় এ অঞ্চলের ইতিহাসেও তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
চিত্তরঞ্জন দাশের জন্ম কলকাতার এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর বাবা ভুবনমোহন দাশ ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের একজন স্বনামধন্য সলিসিটর এবং ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিজীবী। তাঁর মা ছিলেন নিস্তারিণী দেবী। তাঁদের আদি পারিবারিক নিবাস ছিল তৎকালীন ঢাকা জেলার তেলিরবাগ গ্রামে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী অঞ্চলের অন্তর্গত। এ কারণে দেশবন্ধুর পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে বিক্রমপুরের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
শৈশব থেকেই চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। কলকাতার ভবানীপুরে লন্ডন মিশনারি সোসাইটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আইনশাস্ত্র অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেন।
ইংল্যান্ডের মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে ১৮৯৪ সালে কলকাতায় ফিরে আইন পেশায় যুক্ত হন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা, আইনি জ্ঞান ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর ধারণা তাঁকে আইনজীবী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়।
চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত আইনি অধ্যায়গুলোর একটি ১৯০৮ সালের আলিপুর বোমা মামলা। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে তিনি এ মামলায় আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মামলায় তাঁর যুক্তি ও আইনি লড়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত অরবিন্দ ঘোষ খালাস পান। এ মামলার মধ্য দিয়ে চিত্তরঞ্জন দাশ জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকার ষড়যন্ত্র মামলাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায়ও তিনি আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পেলেও চিত্তরঞ্জন দাশের প্রধান পরিচিতি গড়ে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯২২ সালে কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। ওই সময় কংগ্রেসের ভেতরে ব্রিটিশ শাসনাধীন আইনসভায় অংশগ্রহণের প্রশ্নে মতপার্থক্য তৈরি হয়। চিত্তরঞ্জন দাশ মনে করতেন, আইনসভায় প্রবেশ করে ঔপনিবেশিক সরকারের কার্যক্রমের বিরোধিতা এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরির মাধ্যমে স্বরাজের দাবি আরও জোরালো করা সম্ভব।
এই রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই ১৯২৩ সালে মতিলাল নেহরুর সঙ্গে তিনি স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনে অংশ নিয়ে আইনসভায় প্রবেশ করা এবং ব্রিটিশ সরকারের ঔপনিবেশিক নীতির বিরোধিতা করা। স্বরাজ পার্টি অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেও কীভাবে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা যায়, সে ক্ষেত্রে দলটি নতুন রাজনৈতিক কৌশল সামনে আনে।
১৯২৪ সালে কলকাতা করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন চিত্তরঞ্জন দাশ। মেয়র হিসেবে নগর প্রশাসনে সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে গুরুত্ব দেন তিনি। প্রশাসনে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বাড়ানো, নগরবাসীর সুযোগ-সুবিধা উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় তাঁর উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আইন পেশার পাশাপাশি সমাজসংস্কারেও তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। জাতীয় শিক্ষা বিস্তার, নারীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করার পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে স্বরাজ কেবল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির বিষয় ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃত স্বরাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করতেন।
নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ ও উপার্জন জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্যও চিত্তরঞ্জন দাশ স্মরণীয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবায় তাঁর আত্মনিয়োগ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের প্রতি এই দায়বদ্ধতা এবং জনকল্যাণে আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি ‘দেশবন্ধু’ উপাধিতে পরিচিতি পান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কর্মব্যস্ত জীবনের অবসান ঘটে ১৯২৫ সালের ১৬ জুন। দার্জিলিংয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সংগঠককে হারায়। তাঁর শেষযাত্রায় বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক জীবন ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইনজীবী হিসেবে অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে আইনি লড়াই, কংগ্রেসের নেতৃত্ব, স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা এবং কলকাতা করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বীকৃত।
তাঁর জন্ম ও পারিবারিক শিকড়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের সম্পর্কও তাঁকে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান আজও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
জন্মবার্ষিকীতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও মানবসেবার চেতনাও নতুন করে আলোচনায় আসে। ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au