বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে, দুর্ভিক্ষের শঙ্কা

  • 2:14 pm - November 05, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১ বার
বাংলাদেশের মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ছবি : সংগৃহীত

ভাস্কর দত্ত : 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে খাদ্যনিরাপত্তা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে জীবিকা হারাচ্ছেন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর বড় অংশ তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে। শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে বড়রা নিজেদের খাবার কমিয়ে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকট আরও বেড়ে দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

‘বাস্তুচ্যুত, বঞ্চিত’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি বাংলাদেশ ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ সামনে রেখে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘কপ৩১ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জলবায়ু ন্যায়বিচার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়।

খাদ্যসংকটে বাস্তুচ্যুত পরিবার

গবেষণায় দেখা গেছে, সাতক্ষীরা পৌর এলাকার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আনুমানিক ৭ হাজার ৫৭৩টি জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবার বাস করছে। এর মধ্যে ৩৫টি বসতির ৩৫৮টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়।

জরিপে ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারকে তীব্র এবং ২৩ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারকে মাঝারি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পাওয়া গেছে। ৫২ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারকে কখনো কখনো সারাদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে।

পরিবারগুলোর খাবারের সংকট কতটা প্রকট, তা উঠে এসেছে শিশুদের খাবার জোগানোর চিত্রে। ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারে বড়রা কম খেয়েছেন, যাতে শিশুরা খেতে পারে। ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের ঘরে খাবার নেই অথবা সর্বোচ্চ তিন দিনের খাবার মজুত রয়েছে।

পানি ও সামাজিক সুরক্ষায় বঞ্চনা

খাদ্যের পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকটও প্রকট। জরিপে ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারকে অন্তত আংশিকভাবে লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল পাওয়া গেছে। সরকারি জমিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশ উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকিতে রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সরকারি সহায়তা না পেলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়, তা জানেন না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার।

জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক ফাতেমা খাতুন বলেন, দুর্যোগের পর তাঁরা প্রথমে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেন। পরে সাতক্ষীরা শহরে এসে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। তাঁদের ডাস্টবিন, কাজ, পানি ও ঘরবাড়ি কিছুই নেই। পুরুষেরা কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরলেও পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারছেন না।

জলবায়ু সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

স্বদেশ, সাতক্ষীরার নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষ ‘নেই রাজ্যের বাসিন্দা’। তাঁদের ঠিকানা নেই, কর্মসংস্থানের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে সাতক্ষীরায় বাস্তুচ্যুত মানুষ আসতে শুরু করেন। অথচ সরকারি দপ্তরে তাঁদের কোনো হিসাব নেই। রাষ্ট্র বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় বাস্তুচ্যুতির সংকট চক্রাকারে চলছে।

একশনএইড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক অমিত রঞ্জন দে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করছেন অসহায় মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আইলার শিকার ব্যক্তিরা এখনও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কপ৩১ সম্মেলনে তাঁদের অধিকারের বিষয়টি আলোচনায় আনতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ বলেন, সরকারি দপ্তরগুলো দুর্যোগের আগে নয়, পরে কাজ করে। জলবায়ু-বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র তৈরি করা দরকার।

কপ৩১-এ অধিকার ও খাদ্যনিরাপত্তার দাবি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে। উজানে নদীর পানি প্রত্যাহারের বিষয়েও সঠিক হিসাব থাকা জরুরি।

বক্তারা বলেন, আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে কপ৩১। সম্মেলনের মূলমন্ত্র ‘সংলাপ থেকে ঐকমত্য, ঐকমত্য থেকে কর্ম’ কতটা কার্যকর, তা বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নের মধ্য দিয়েও বিবেচনা করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে খানি বাংলাদেশের সহসভাপতি রেজাউল করিম সিদ্দিক বলেন, জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের তৃণমূলের মানুষের কথাগুলো তুলে ধরতে হবে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ, জরুরি খাদ্য সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষায় অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পুষ্টিসেবা, কর্মসংস্থান ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

 

 

 

এই শাখার আরও খবর

রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেন ভ্যান্স

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর দাবি, যুদ্ধ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভের…

জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৬ পদক্ষেপ, বছরে বাঁচতে পারে ১৬ লাখ প্রাণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ছয়টি কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। একই সঙ্গে কার্বন…

বার্সেলোনার বড় ধাক্কা, এক মাস মাঠের বাইরে রদ্রি

চোটের কারণে প্রায় এক মাসের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে যেতে পারেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি। ডান পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচে তাঁকে পাচ্ছে…

বিশ্ব কি ঘুমের ঘোরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাড়ছে অস্থিরতা, শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে তীব্র হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একের পর এক সংঘাত, সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের প্রতি অবজ্ঞা বিশ্বব্যবস্থাকে…

নির্বাচনে ৪৫৫ মিলিয়ন ডলার ঢেলেও হার, ইলন মাস্ককে নিয়ে উপহাস

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তবে শত শত…

কবে দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা, সিদ্ধান্ত হবে ৭ নভেম্বর

ভাস্কর দত্ত :  সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। আগামী ৭ নভেম্বর দলটির…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au