নির্বাচনে ৪৫৫ মিলিয়ন ডলার ঢেলেও হার, ইলন মাস্ককে নিয়ে উপহাস
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তবে শত শত…
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাড়ছে অস্থিরতা, শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে তীব্র হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একের পর এক সংঘাত, সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের প্রতি অবজ্ঞা বিশ্বব্যবস্থাকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বকে আর কখনো এতটা অস্থিতিশীল অবস্থায় দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ব কি ধীরে ধীরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
বিশ্বের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের জায়গায় আবির্ভূত হচ্ছে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির প্রতি বড় শক্তি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতাধর দেশগুলোর অবজ্ঞা রাষ্ট্রগুলোকে এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সমঝোতার পরিবর্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
শক্তিধর দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ আদায়ে অন্য রাষ্ট্রের ওপর সামরিক চাপ কিংবা নানা ধরনের বলপ্রয়োগমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। একসময় যে সামরিক শক্তি ছিল শেষ অবলম্বন, এখন অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠছে প্রথম পছন্দ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের পরও এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর শুরু হচ্ছে কূটনৈতিক তৎপরতা।
বিশ্বজুড়ে সংঘাতের বিস্তারও উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সুইডেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে সক্রিয় সংঘাতের সংখ্যা ছিল ৬৫টি। ফলে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কতটা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও কলামিস্ট গিডিয়ন র্যাচম্যান তাঁর নতুন বই War Is Interested in You: The Breakdown of International Order and the Threat of World War Three-তে। বইটির শিরোনাম নেওয়া হয়েছে রুশ বিপ্লবী লিওন ট্রটস্কির একটি বিখ্যাত উক্তি থেকে, ‘আপনি যুদ্ধ নিয়ে আগ্রহী না হলেও যুদ্ধ আপনার প্রতি আগ্রহী।’ অর্থাৎ কেউ যুদ্ধ চায় কি না, তা দিয়ে যুদ্ধের বাস্তবতা নির্ধারিত হয় না। পরিস্থিতি তৈরি হলে যুদ্ধ মানুষের ওপর চাপিয়ে আসতে পারে।
র্যাচম্যানের মতে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙনের পেছনে তিনটি মৌলিক কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন দেশে এমন একধরনের শক্তিমান নেতার উত্থান ঘটেছে, যাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে যুদ্ধকে বৈধ ও প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন। তৃতীয়ত, এই দুই প্রবণতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
র্যাচম্যানের ভাষায়, ‘আইন দ্বারা পরিচালিত বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই শক্তির জোরে অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে।’

ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিস্ফোরণের ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ সময় ধোঁয়ার পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক পাখি। ২০২৬ সালের ২ মার্চ ইরানের তেহরানে তোলা ছবি। ছবি: রয়টার্স।
বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনে বড় শক্তিগুলোর ভূমিকা
র্যাচম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা জোটের আপেক্ষিক প্রভাব কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে আসা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট দেশগুলো। তারা নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হচ্ছে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থান এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। একইভাবে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং মিত্রদের মতামত উপেক্ষার ঘটনাও বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে তাঁর বিশ্লেষণ।
এ ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মনে করেন র্যাচম্যান। তাঁর মতে, তাঁরা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে গুরুত্ব না দিয়ে ভূখণ্ড দখল ও শক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রবণতাকে উৎসাহিত করছেন।
র্যাচম্যানের মতে, ট্রাম্প ও পুতিন উভয়েই ‘প্রভাববলয়’ বা স্ফিয়ার অব ইনফ্লুয়েন্স তত্ত্বে বিশ্বাসী। এই ধারণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিয়মের চেয়ে নির্দিষ্ট অঞ্চলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বেশি কার্যকর উপায়। পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের মনরো নীতি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগকে এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন তিনি।
সংঘাতের আশঙ্কায় বাড়ছে সামরিক ব্যয়
বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ও বাড়ছে। শক্তিমান নেতাদের পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত নিয়ম দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে নতুন নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
র্যাচম্যানের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই ভাঙন শুধু সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যযুদ্ধ, সংরক্ষণবাদী অর্থনৈতিক নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপও বৈশ্বিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
বর্তমান বিশ্বের বড় যুদ্ধগুলো আলাদা আলাদা অঞ্চলে সংঘটিত হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে। সংঘাতগুলো আরও বিস্তৃত হলে একপর্যায়ে সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মাত্রা নিয়ে র্যাচম্যানের বিশ্লেষণ পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানকে নিয়ে তিনি যে ‘অস্থিরতার অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অব আপহিভাল’-এর ধারণা দিয়েছেন, তা বাস্তবতার তুলনায় কিছুটা অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন সমালোচকরা। দেশগুলোর প্রত্যেকের স্বার্থ ও কৌশলগত লক্ষ্য এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অবসান চাইলেই তারা একটি সমন্বিত সামরিক জোটে পরিণত হয়েছে, এমনটা বলা যায় না।
র্যাচম্যান নিজেও রাশিয়া ও চীনের অংশীদারত্বের সীমাবদ্ধতা এবং এই চার দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ফলে তাদের মধ্যে বাস্তব ও আদর্শিক ঐক্যের যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, তা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়।
বিশ্বযুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী?
সংঘাতপূর্ণ বিশ্ব কি শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে র্যাচম্যান সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, একটি যুদ্ধকে বিশ্বযুদ্ধ বলতে হলে দুটি শর্ত পূরণ হতে হবে।
প্রথমত, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই সংঘাত একাধিক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে হবে।
বর্তমান বিশ্বে এখনো এই দুটি শর্ত পূরণ হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। র্যাচম্যানের মতে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত।

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন জরুরি সেবাকর্মীরা। ইউক্রেনের খারকিভে এ হামলা ঘটে। বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স।
দক্ষিণ এশিয়াও ঝুঁকির বাইরে নয়
বইটির একটি অধ্যায়ে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সামরিক সংঘাত নিয়েও আলোচনা করেছেন র্যাচম্যান। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী দেশের এই সংঘাতকে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখেছেন।
তাঁর বিশ্লেষণে, এই সংঘাত ভারতের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পাকিস্তানকে পৃথকভাবে বিবেচনা করে বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল।
এই সংঘাত থেকে র্যাচম্যানের অন্যতম পর্যবেক্ষণ হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের বিপজ্জনক যুদ্ধের ঝুঁকি থাকলেও বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের তুলনায় তা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। বিশেষ করে সংকটের সময় দুই দেশই ক্রমবর্ধমান অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করায় ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, গিডিয়ন র্যাচম্যানের বইটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার সংকট, যুদ্ধের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক শান্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁর সব বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও বইটি একটি বাস্তবতা তুলে ধরে: আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হলে আঞ্চলিক সংঘাতও বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
সূত্র: রয়টার্স
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au