গাঁজা সেবনের সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে হত্যার কথা। ছবি: সংগৃহীত
গাঁজা সেবনের সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে হত্যার কথা। আর সেই একটি কথাতেই প্রায় পাঁচ বছর আগে মাগুরায় সংঘটিত এক হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট খুলেছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, নিহত ব্যক্তিকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেছিলেন তারই বড় ভাই।
নিহত মানিক লাল ডোমের ছেলে অশোন লাল ও অভিযুক্ত মেহেদী হাসান আকাশের মধ্যে মাগুরা শহরের সুইপার কলোনিতে একদিন বিরোধ বাধে। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে আকাশ অশোনকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোমার বাবার সঙ্গে যা করেছি, তোমার সঙ্গেও ঠিক তাই করব।’
৩০ বছর বয়সী আকাশ স্থানীয় মাছবাজারের একজন শ্রমিক। ঘটনার সময় দুজন গাঁজা সেবন করছিলেন। আকাশের মুখ ফসকে বলা এই কথাই প্রায় পাঁচ বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই সূত্র ধরে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে।
সিআইডির তদন্তে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৯ জুন রাতে মাগুরার সুইপার কলোনির বাড়িতে ছোট ছেলে সান বাবুর সঙ্গে ঘুমাতে যান ৩৫ বছর বয়সী মানিক লাল। পরদিন ভোর চারটার দিকে নয় বছর বয়সী সান বাবুর ঘুম ভাঙলে সে দেখতে পায়, তার বাবা রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পরদিন মাগুরা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন মানিকের স্ত্রী আশা রানি।
প্রথমে স্থানীয় পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় সাড়ে তিন বছর তদন্ত করেও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। ২০২৫ সালের মে মাসে কোনো আসামির নাম উল্লেখ না করেই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পিবিআই।
তবে আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে একই বছরের অক্টোবরে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। দায়িত্ব দেওয়া হয় মাগুরা সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমানকে।
তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিহত মানিকের ছেলে অশোনের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় বাবার হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে আকাশের দেওয়া হুমকির বিষয়টি জানান অশোন। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আকাশের ওপর নজর দেন তদন্ত কর্মকর্তা।
গত ২৬ এপ্রিল মাগুরার পুরোনো মাছবাজার এলাকা থেকে আকাশকে আটক করা হয়। এসআই আনিসুর রহমান বলেন, ‘আকাশের ওই মন্তব্য আমার সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। আমি তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করি এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে নিয়ে আসি।’
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন আকাশ। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও তিন সহযোগীর নাম জানান। এরপর দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে কথিত মূল পরিকল্পনাকারীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
গ্রেপ্তার অন্য আসামিরা হলেন হীরা লাল ডোম (৫০), লিয়াকত আলী ওরফে ঝন্টু (৬৯), শিকল সাঁইজি ওরফে লিটন পাগলা ওরফে রুবেল (৪০) এবং নিরঞ্জন কুমার দাস (৪৩)। তাঁদের মধ্যে রুবেলকে ওই বছরের ১৫ জুলাই ঢাকার শাহ আলী মাজার এলাকা থেকে তৎকালীন র্যাব-৪, বর্তমানে এসআরবি-৪-এর সহায়তায় গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, মানিক ও তাঁর বড় ভাই হীরা লালকে ঘিরে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ছিল। তাঁদের বাবা-মা সরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁদের মৃত্যুর পর হীরা লাল বাবা-মায়ের সম্পূর্ণ পেনশনের টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
এ ছাড়া বাবা-মায়ের দেওয়া পৈতৃক জমি নিয়েও তাঁদের বিরোধ ছিল। জমিটি নিয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সঙ্গে আইনি জটিলতা চলছিল। এসব বিষয় নিয়ে মানিক প্রায়ই বড় ভাই হীরাকে অপমান ও দুর্ব্যবহার করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। একপর্যায়ে অপমানের প্রতিশোধ নিতে হীরা লাল ছোট ভাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে সিআইডির দাবি।
এ কাজে তিনি মানিকের ওপর ক্ষুব্ধ আরও চারজনকে যুক্ত করেন। মাদক কেনাবেচা ও সেবন নিয়ে তাঁদের সঙ্গে মানিকের বিরোধ ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, একবার বিরোধের জেরে মানিক ঝন্টুকে চড় মেরেছিলেন।
সিআইডির তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া দুই আসামি আকাশ ও রুবেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩০ জুন ভোর চারটার দিকে চার ভাড়াটে খুনি মানিকের ঘরে প্রবেশ করেন।
তদন্তে বলা হয়েছে, আকাশ মানিকের দুই পা চেপে ধরেন। রুবেল ও নিরঞ্জন তাঁর হাত ও বুক চেপে রাখেন। অন্যদিকে লিয়াকত তাঁর মুখ চেপে ধরে মেঝেতে নামিয়ে আনেন। এরপর ভারী দা দিয়ে মানিকের গলা কেটে হত্যা করেন। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তাঁরা।
পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার এবং তাঁদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার পর সম্প্রতি তদন্ত শেষ করেছে সিআইডি।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনিসুর রহমান বলেন, আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার আগে চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য এর খসড়া সিআইডি সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।