স্বদেশের মুক্তি ও মানুষের জাগরণে এক মহাপ্রাণ: মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত। ছবি: সংগৃহীত
ইতিহাস কখনো কখনো তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সময়ের আবর্তে আড়াল করে রাখে। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, আদর্শ, ত্যাগ ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে যুগের সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত ছিলেন তেমনই এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, শিক্ষাবিস্তার, সমাজসংস্কার ও মানবকল্যাণে তাঁর অসামান্য অবদান তাঁকে শুধু বরিশালের নয়, সমগ্র বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁকে যথার্থই বলা হয় আধুনিক বরিশালের অন্যতম রূপকার।
অশ্বিনী কুমার দত্ত বিশ্বাস করতেন, একটি পরাধীন জাতিকে প্রকৃত অর্থে জাগিয়ে তুলতে হলে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা, নৈতিকতা, আত্মমর্যাদাবোধ ও দেশপ্রেমের বিকাশ। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি শিক্ষাবিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। ১৮৮৪ সালে পিতা ব্রজমোহন দত্তের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বরিশালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রজমোহন স্কুল এবং ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রজমোহন কলেজ। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ বাংলায় শিক্ষার প্রসার ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে এই প্রতিষ্ঠান দুটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি বাখরগঞ্জ হিতৈষিণী সভা, বালিকা বিদ্যালয়, পিপলস অ্যাসোসিয়েশন এবং স্থানীয় স্বশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও প্রেরণাদাতা ছিলেন অশ্বিনী কুমার দত্ত। বিদেশি পণ্য বর্জন, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে তিনি গড়ে তোলেন স্বদেশ বান্ধব সমিতি। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বে সমিতিটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এর প্রায় ১৬০টিরও বেশি শাখা বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে গণজাগরণ সৃষ্টি করে। সমিতির কার্যক্রম শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; শিক্ষা, সমাজসেবা, স্বনির্ভরতা ও জনসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী অশ্বিনী কুমার দত্তের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গণভিত্তিক আন্দোলনকে নিজেদের শাসনের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ১৯০৮ সালে স্বদেশ বান্ধব সমিতি নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করে নির্বাসিত করা হয়। লক্ষ্ণৌতে বন্দিজীবন শেষে ১৯১০ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি আবারও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কারাবাস তাঁর দেশপ্রেম ও আদর্শিক অবস্থানকে বিন্দুমাত্র দুর্বল করতে পারেনি।
অশ্বিনী কুমার দত্তের দেশপ্রেম কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ ছিল না। আর্তমানবতার সেবা ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। ১৯১৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বরিশাল অঞ্চলের মানুষ যখন বিপর্যস্ত, তখন তিনি দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং ত্রাণকার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মানবিক নেতৃত্ব ও জনসম্পৃক্ততা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর বরিশাল সফরও অশ্বিনী কুমার দত্তের রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তাঁর দেশপ্রেম, ত্যাগ ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড সমকালীন জাতীয় নেতাদের কাছেও গভীর শ্রদ্ধার বিষয় ছিল। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। ১৯২২ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে ও স্টিমার কোম্পানির শ্রমিকদের ধর্মঘটের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল শোষিত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ।
রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অশ্বিনী কুমার দত্ত ছিলেন একজন মননশীল লেখক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ। তাঁর রচিত ‘ভক্তিযোগ’, ‘কর্মযোগ’, ‘প্রেম’ ও ‘ভারতগীতি’ প্রভৃতি গ্রন্থে তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর কাছে দেশপ্রেম ছিল কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং মানুষের নৈতিক উন্নয়ন, আত্মশক্তির বিকাশ এবং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
১৯২৩ সালের ৭ নভেম্বর এই মহান দেশপ্রেমিক পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর জীবন, কর্ম ও আদর্শ আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি দেখিয়েছেন, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষার বিস্তার, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং আত্মনির্ভরতার চেতনা।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তকে নতুন করে স্মরণ করার তাৎপর্য আরও গভীর। যখন সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের চর্চা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন তাঁর জীবনদর্শন আমাদের পথ দেখাতে পারে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব, সমাজসেবা এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী, সমাজসংস্কারক, মানবতাবাদী ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তাঁর আদর্শকে ধারণ করে একটি শিক্ষিত, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সমাজ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের এই মহান সন্তানকে স্মরণ করা মানে আমাদের শেকড়, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে নতুন করে আবিষ্কার করা।
( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)