লিবিয়ার উপকূল থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ পর্যন্ত নতুন রুট খোলায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পথে আগমন আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ জুলাই-
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে সংখ্যায় সবার শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা। ইইউ সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা ফ্রন্টেক্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ সময়ের মধ্যে ৭৫ হাজার ৯০০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।
ফ্রন্টেক্স জানিয়েছে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এবং পশ্চিম আফ্রিকান রুট দিয়ে আগমন কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। তবে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট এখনো ব্যস্ত রয়েছে। ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী ইইউতে প্রবেশ করেছেন। এর পরই রয়েছেন মিশর ও আফগানিস্তানের নাগরিকরা।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে আগমন ২৫ ভাগ কমে ১৯ হাজার ৬০০ জনে দাঁড়িয়েছে। যদিও লিবিয়ার উপকূল থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ পর্যন্ত নতুন রুট খোলায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পথে আগমন আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে প্রথম ছয় মাসে ২৯ হাজার ৩০০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী পৌঁছেছেন, যা গত বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার জন্য লিবিয়া এখনো প্রধান ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশটির উপকূল থেকে ইতালিতে পৌঁছেছেন ২০ হাজার ৮০০ জন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি বৃদ্ধি।
পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুটেও এ বছর আগমন বেড়েছে ১৯ ভাগ। শুধু জুন মাসেই এই রুট ব্যবহার করে আগমন দ্বিগুণ হয়েছে। এই রুটে এখনো আলজেরিয়া প্রধান ট্রানজিট দেশ হিসেবে রয়ে গেছে। ফ্রন্টেক্স জানিয়েছে, পাচারকারীরা উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য রুট ছেড়ে এ দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
বিপরীতে, পশ্চিম আফ্রিকান রুটে অভিবাসনপ্রত্যাশীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে এ রুটে শনাক্ত করা হয়েছে ১১ হাজার ৩০০ জন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। শুধু জুন মাসে এই রুট দিয়ে আসা অভিবাসীর সংখ্যা মাত্র ৩০০ জনে নেমে এসেছে। ফ্রন্টেক্স মনে করছে, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ট্রানজিট দেশগুলোর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কারণে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে এই বিপজ্জনক যাত্রায় জীবনহানিও অব্যাহত আছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৬০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী।
ইতালির পরিসংখ্যানে শীর্ষে বাংলাদেশিরা
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা শাখার দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত ইতালিতে পৌঁছেছেন ৩১ হাজার ৯৪৮ জন অনিয়মিত অভিবাসনপ্রত্যাশী। এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম।
চলতি বছর ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সংখ্যায় সবার শীর্ষে আছেন। এ সময়ের মধ্যে ১০ হাজার ৩১১ জন বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছেছেন, যা মোট আগমনের প্রায় ৩২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইরিত্রিয়ার ৪ হাজার ৪৬১ জন এবং মিসরের ৩ হাজার ৭২৩ জন নাগরিক।
তালিকায় আরও আছে পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, সুদান, সিরিয়া, সোমালিয়া, গিনি, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, ইরান, নাইজেরিয়া, মালি এবং আইভরিকোস্টের অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।
এছাড়া চলতি বছরের ৭ জুলাই পর্যন্ত ইতালিতে পৌঁছানো সঙ্গীবিহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৫৭৫ জনে। তুলনায়, ২০২৪ সালের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল আট হাজার ৭৫২ জন।
মানবাধিকার সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও ভালো জীবনের আশায় জীবন ঝুঁকির এই যাত্রা চলছেই। আবার কোথাও অভিবাসী প্রবাহ কমলেও, নতুন রুট খোলায় অন্য কোথাও বেড়ে যাচ্ছে; ফলে এই সংকটের সমাধান এখনও অধরাই থেকে যাচ্ছে।
সুত্রঃ ফ্রন্টেক্স