গত ১৪ জুলাই তেহরানে আয়োজিত একটি স্মরণ অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: ইরান ইন্টারন্যাশনাল
মেলবোর্ন, ১৭ জুলাই-
ইসরায়েলের সঙ্গে টানা ১২ দিনের সংঘাতের পর ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সেই উত্তেজনার কেন্দ্রে এবার দেশটির সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উৎখাত করে ‘অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা’ করার অভিযোগ তুলেছেন কট্টরপন্থী রাজনীতিকরা।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের খবরে বলা হয়, ইরানের ৩০ জনের বেশি পার্লামেন্ট সদস্য প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। যুদ্ধোত্তর সময়ে এই অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা ইরানে গভীর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কট্টরপন্থীদের অভিযোগ, তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী অবস্থানে থাকা পেজেশকিয়ান ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করছেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে ইরানের কূটনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাবেক এমপি ও রাষ্ট্রদূত আবুলফজল জোহরেভান্দ এক ভাইরাল ভিডিওতে বলেন, “পেজেশকিয়ানের সরকার ইসলামি বিপ্লব ও খামেনির শাসনের অবসান ঘটিয়ে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে (ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর চুক্তি) যোগ দিতে চায়। এটা বিপ্লববিরোধীদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা।”
তবে এসব বক্তব্যকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক অতিরঞ্জন’ বলে মনে করছেন। খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও সহ-রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মোখবের স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রেসিডেন্টের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে, এটা ঠিক হচ্ছে না।”
১৩ জুলাই প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাঁর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, “যারা আমাদের সমালোচনা করে, তারা সবাই শত্রু নয়। জবরদস্তির মাধ্যমে সরকার গঠন বা মত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।”
সংস্কারপন্থীরা বলছেন, যুদ্ধোত্তর সময় ঐক্যের হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু দেশ এখন আরও গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। সাবেক সরকারি মুখপাত্র আলী রাবিয়ি লিখেছেন, “যুদ্ধের ধুলা এখনো বসেনি, অথচ বিভাজনের আওয়াজ ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বিভক্তি রোধ না করলে তা দেশের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠবে।”
ইরানের প্রখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী ও সাবেক সংসদ সদস্য আহমাদ শিরজাদ বলেন, “সরকারকে অবশ্যই আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। জনগণকে শাসনব্যবস্থার অংশীদার করতে হবে।”
সংস্কারপন্থী ফ্রন্টের মুখপাত্র জাভাদ ইমাম এক বিবৃতিতে বলেন, “সরকার যদি জনগণের দাবি উপেক্ষা করে, তাহলে আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না। সকল রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিতে হবে, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে প্রবাসীদের দেশে ফিরতে দিতে হবে।”
পেজেশকিয়ান একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক নির্বাচনে তার বিজয়ে অনেকেই ইরানে একটি নরম রাজনৈতিক হাওয়ার আশাবাদ দেখেছিলেন। তবে তার শাসনামলের শুরুতেই এই ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ বিতর্ক ও অভ্যুত্থানের অভিযোগ ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।