গোপালগঞ্জ সদর থানা; ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ জুলাই-
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত সমাবেশ ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় চারটি পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার (১৯ জুলাই) রাতে গোপালগঞ্জ সদর থানায় এসব মামলা করা হয়।
গোপালগঞ্জে সংঘাত-সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন—গোপালগঞ্জ পৌরসভার উদয়ন রোডের দীপ্ত সাহা (২৫), টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সোহেল রানা মোল্লা (৩৫), কোটালীপাড়া উপজেলার হরিণাহাটি গ্রামের রমজান কাজী (১৮), ভেড়ারবাজার ব্যাপারীপাড়া এলাকার ইমন তালুকদার (১৮) এবং থানাপাড়া এলাকার রমজান মুন্সী (৩৫)।
এদের মধ্যে দীপ্ত সাহা, সোহেল রানা মোল্লা, রমজান কাজী ও ইমন তালুকদারের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। সোহেল হত্যার বাদী সদর থানার এসআই আবুল কালাম আজাদ, দীপ্ত সাহা হত্যায় এসআই শামীম হোসেন, ইমন হত্যায় এসআই শেখ মিজানুর রহমান এবং রমজান কাজী হত্যায় এসআই আইয়ুব আলী বাদী হয়ে মামলা করেন। প্রতিটি মামলাতে অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তবে রিকশাচালক রমজান মুন্সীর মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মির মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, এসব মামলা গতকাল রাতেই দায়ের করা হয়েছে। বাকি একজনের (রমজান মুন্সী) হত্যার মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে মামলার কপি এখনই দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
পুলিশ সূত্র জানায়, রমজান কাজী হত্যার ঘটনায় এসআই আইয়ুব হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়, গত বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জ থেকে মাদারীপুর যাওয়ার পথে এসকে সালেহিয়া মাদ্রাসার কাছে এনসিপির গাড়িবহরের ওপর স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীসহ প্রায় ১ হাজার ৫০০ দুষ্কৃতিকারী দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে রমজান কাজী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
দীপ্ত সাহা হত্যার ঘটনায় করা আরেকটি মামলায় উল্লেখ করা হয়, ওইদিন দুপুর আড়াইটার দিকে গোপালগঞ্জ শহরের কলেজ মসজিদের পাশে মিলন ফার্মেসির সামনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশ লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে দীপ্ত সাহা গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
সোহেল রানা মোল্লার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বলা হয়, শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় আওয়ামী লীগ ও দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে তিনি নিহত হন। একই এলাকা—পুরাতন সোনালী ব্যাংকের সামনে ইমন তালুকদারও গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এসব ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় আরও ৩ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
অপরদিকে, ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে রিকশাচালক রমজান মুন্সী মারা যান। তার মৃত্যুতেও একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে নিহতদের মধ্যে রমজান মুন্সী ছাড়া বাকি চারজনের লাশের সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, বিলম্বে হলেও ময়নাতদন্ত করা হবে। তবে দীপ্ত সাহার লাশ ইতিমধ্যে দাহ করা হওয়ায় সেখানে ময়নাতদন্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ঘটনার পটভূমি অনুযায়ী, জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার গোপালগঞ্জে যান। তার আগের রাতেই দলটির পক্ষ থেকে কর্মসূচিকে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ নামে ঘোষণা দেওয়া হয়, যা উত্তেজনার সৃষ্টি করে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সমাবেশ প্রতিহতের ঘোষণা দেন।
এনসিপি নেতাদের গাড়িবহর গোপালগঞ্জে যাওয়ার পথে একাধিক বাধার সম্মুখীন হয়। সকালে পুলিশ ও ইএনওর গাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে, যার জন্য স্থানীয় প্রশাসন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দায়ী করে।
দুপুরে গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশস্থলে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছান এনসিপি নেতারা। তারা বক্তব্য দিয়ে মাদারীপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে ফের তাদের গাড়িবহরের ওপর হামলা চালানো হয়।
পরে পুলিশ এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ এই প্রাণহানি ঘটে।
ঘটনার পর গোপালগঞ্জে রাতেই কারফিউ জারি করা হয়। যৌথ বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুরো জেলায় গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে।