জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২১ জুলাই-
জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও পদ ছাড়তে রাজি নন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) এবং মিত্র দল কোমেইতো উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনের ফলাফলকে ‘কঠিন’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইশিবা জানিয়েছেন, তিনি ফলাফলকে সম্মান জানালেও এখনই তার পদত্যাগ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং তার দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনার দিকে।
জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে মোট ২৪৮টি আসন রয়েছে। এবারের নির্বাচনে জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে প্রয়োজন ছিল কমপক্ষে ৫০টি আসনে জয়। কিন্তু এনএইচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন জোট মাত্র ৪৭টি আসনে জয় পেয়েছে, একটি আসনের ফলাফল এখনও ঘোষণা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জাপানের রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখা এলডিপি-কোমেইতো জোট এবার উচ্চকক্ষেও নিয়ন্ত্রণ হারাল, যা সরকারের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে গত বছর নিম্নকক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিল এলডিপি। ফলে দুই কক্ষেই প্রভাব হারানোর পর প্রধানমন্ত্রী ইশিবার নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, অতীতে এলডিপির তিনজন প্রধানমন্ত্রী উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর দুই মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের পরাজয়ের পেছনে রয়েছে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা, যা প্রকাশ পেয়েছে ব্যয়বহুল জীবনযাপন ও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে। অনেকেই চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ। এর পাশাপাশি সম্প্রতি এলডিপিকে ঘিরে একাধিক দুর্নীতির ঘটনা সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমিয়ে দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের হতাশা প্রকাশ করেছে।
নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের একাংশ সমর্থন হারিয়েছে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল সানসেইতো পার্টির প্রতি। কোভিড মহামারির সময় টিকা বিষয়ক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসা দলটি এবারে ‘জাপানিজ ফার্স্ট’ ধারা তুলে ধরে অনেক রক্ষণশীল ভোটারকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। সানসেইতো পার্টির নির্বাচনী প্রচারে বিদেশিদের কারণে জাপানি সংস্কৃতি ও জীবনের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এমন বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বিদেশিদের অপরাধ ও খারাপ আচরণ ঠেকাতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ইশিবা একটি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে এলডিপির ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনাও এখন আলোচনায়। দলের সাবেক নেতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অনুসারীরা মনে করেন, ইশিবা যথেষ্ট রক্ষণশীল নন এবং তার চীনের প্রতি অবস্থান দুর্বল। এই অস্বস্তির সুযোগ নিয়েই রক্ষণশীল ভোটব্যাংক সরে গেছে সানসেইতো’র দিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেফরি হল বলেন, শিনজো আবের সমর্থকরা চাইছেন একজন নতুন, আরও দৃঢ় অবস্থানের নেতা আসুক এলডিপির নেতৃত্বে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন—সানায়ে তাকাইচি, যিনি গতবার নেতৃত্ব নির্বাচনে দ্বিতীয় হয়েছিলেন, সাবেক মন্ত্রী তাকাইয়ুকি কোবায়াশি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমির ছেলে শিনজিরো কোইজুমি।
যদি দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে, তাহলে তা শুধু জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনাতেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ সরকারে নেতৃত্বে পরিবর্তন হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়।
তবে আপাতত প্রধানমন্ত্রী ইশিবা তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি বলেছেন, জনগণের বার্তা তিনি গ্রহণ করছেন, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং অর্থনীতি ও কূটনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই তার লক্ষ্য। তবুও রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা তুঙ্গে—এই সরকার আর কতদিন টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে।
সুত্রঃ বিবিসি