বাংলাদেশ অংশের ব্রহ্মপুত্র নদ; ছবিঃ ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই-
তিব্বতের ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু করেছে চীন, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। দেশটির দাবি, এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যা যুক্তরাজ্যের পুরো বছরের বিদ্যুৎ চাহিদার সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। প্রকল্পটি এতটাই বিশাল যে এটি চীনের নিজস্ব থ্রি গর্জেস বাঁধের উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে যাবে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং সম্প্রতি এ প্রকল্পের নির্মাণ শুরুর ঘোষণা দেন। এর পরপরই চীনের নির্মাণ ও প্রকৌশল খাতের শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে। বেইজিং বলছে, এই প্রকল্প পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে গতি আনবে। তবে চীনের এই উদ্যোগ ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, কারণ ব্রহ্মপুত্র নদ এসব দেশের লাখো মানুষের জীবিকা, কৃষি ও পানি ব্যবস্থার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস।
কোথায় হচ্ছে বাঁধটি
চীন তিব্বতের মালভূমিতে ইয়ারলুং জাংপো নদের যে অংশে বাঁধ নির্মাণ করছে, সেখানে নদীটি ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত এবং প্রায় ২ হাজার মিটার উচ্চতা থেকে নিচে নেমে এসেছে। এই প্রাকৃতিক অবস্থান চীনের জন্য বিপুল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ এনে দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে ধাপে ধাপে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে এবং ২০৩০-এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানায়নি চীন।
প্রতিবেশীদের উদ্বেগ
এই বাঁধ প্রকল্প ব্রহ্মপুত্র নদে পানিপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ভারত ও বাংলাদেশ। বিশেষ করে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ এবং আসাম ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে, আবার শুষ্ক মৌসুমে ভয়াবহ পানিসঙ্কট দেখা দিতে পারে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলার জানান, শুধু পানি প্রবাহই নয়, এই বাঁধ ভাটির দিকে পলি প্রবাহও বন্ধ করে দিতে পারে। আর এই পলিমাটি বন্যাপ্রবণ এলাকার কৃষির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
চীনের তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা এবং সীমান্তে পুরোনো সংঘাতের ইতিহাস ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সায়ানাংশু মোদক বলেন, “চীন ইচ্ছাকৃতভাবে পানিপ্রবাহ বন্ধ বা ঘুরিয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
চীনের অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাঁধ প্রকল্প তাদের সার্বভৌম অধিকারের আওতায় পড়ে এবং এটি শুধু পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎস নয়, বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করবে বলে দাবি করছে বেইজিং।
পানির ঘাটতির বাস্তবতা কী?
তবে সব আশঙ্কা যে বাস্তব, তা নয় বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সায়ানাংশু মোদকের মতে, ব্রহ্মপুত্রের পানি মূলত হিমালয়ের দক্ষিণ দিকের মৌসুমি বৃষ্টিপাত থেকেই আসে, চীন অংশ থেকে নয়। এছাড়া চীনের প্রকল্পটি “রান অব দ্য রিভার” প্রযুক্তিতে নির্মিত হবে, যার মানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রোধ না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।
ভারতও ব্রহ্মপুত্র নদে দুটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে অরুণাচলে ১১.৫ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে চীনের প্রকল্পকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পানি নিয়ে বিরোধ নতুন নয়
পানি ও বাঁধ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ নতুন কিছু নয়। যেমন পাকিস্তান অভিযোগ করছে, ভারত কাশ্মীর অঞ্চলে পানির উৎসগুলো নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করছে এবং ১৯৬০ সালের সিন্ধু চুক্তির কার্যকারিতা বন্ধ করে দিয়েছে। এইসব বিতর্কের পেছনে পানি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা
তিব্বতের যে এলাকায় চীন বাঁধ নির্মাণ করছে, সেটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এছাড়া ভূমিধস, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা এবং প্রচণ্ড ঝড়ের জন্যও অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে একটি বিশাল বাঁধ সেখানে নির্মাণ করা প্রকৌশলগত ও নিরাপত্তাগতভাবে কতটা নিরাপদ—তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য ও পরিকল্পনা ভাগাভাগি করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য মারাত্মক পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এই প্রকল্প।
সুত্রঃ রয়টার্স