বৃহস্পতিবার সকালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়; ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই-
থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার মধ্যকার সীমান্ত বিরোধের জেরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) থাইল্যান্ড একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে ক্যাম্বোডিয়ায় বোমা হামলা চালিয়েছে। দুই দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ শুরু করার অভিযোগ তুলেছে। হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
থাই সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ছয়টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি যুদ্ধবিমান ক্যাম্বোডিয়ার একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনীর উপ-প্রবক্তা রিচা সুকসুয়ানন জানান, ‘‘পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আকাশপথে হামলা করেছি।’’ সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থাইল্যান্ড ক্যাম্বোডিয়ার সঙ্গে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে ক্যাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, থাই বিমান দুটি বোমা ফেলে একটি সড়ক ধ্বংস করে। বিবৃতিতে এই হামলাকে ‘‘থাইল্যান্ডের বেপরোয়া ও নিষ্ঠুর আগ্রাসন’’ হিসেবে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার সকালে, থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত বিতর্কিত ‘তা মোয়ান থম’ মন্দির এলাকায়। এটি ব্যাংকক থেকে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ। থাই সেনা সূত্র বলছে, ক্যাম্বোডিয়া প্রথমে একটি নজরদারি ড্রোন পাঠায় এবং পরে ভারী অস্ত্রসহ সৈন্য মোতায়েন করে। এরপর ক্যাম্বোডিয়ার সেনারা গুলি চালালে দুই থাই সৈন্য আহত হয়।
সরাসরি সংঘর্ষ শুরুর আগে থাইল্যান্ড তাদের রাষ্ট্রদূতকে ক্যাম্বোডিয়া থেকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং ব্যাংককে অবস্থানরত ক্যাম্বোডিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করার ঘোষণা দেয়। কারণ হিসেবে একটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে দ্বিতীয়বারের মতো থাই সেনার পা হারানোকে উল্লেখ করা হয়। থাইল্যান্ডের দাবি, এই মাইন সম্প্রতি ক্যাম্বোডিয়া সীমান্ত এলাকায় পুঁতে রাখা হয়েছে। তবে ক্যাম্বোডিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, থাই সেনারা অনুমোদিত পথ ছেড়ে সরাসরি পুরনো যুদ্ধের সময়কার একটি মাইনের ওপর পা দেয়।
তীব্র গোলাগুলির মধ্যে থাইল্যান্ডের সুরিন সীমান্ত প্রদেশের বাসিন্দারা কংক্রিট, বালির বস্তা এবং গাড়ির টায়ার দিয়ে বানানো বাঙ্কারে আশ্রয় নেয়। স্থানীয় এক নারী থাই পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিসকে (TPBS) বলেন, ‘‘কত রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে, তা বলা কঠিন।’’ তার বক্তব্যের সময় পেছনে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
সুরিন জেলার কাবচিয়াং জেলার প্রধান সুত্থিরত চ্যারোন্থানাসাক জানান, ‘‘ক্যাম্বোডিয়ার গোলাবর্ষণে সাধারণ মানুষের বাড়িতে আঘাত হানে। এ ঘটনায় দুই জন মারা গেছেন এবং ৮৬টি গ্রাম থেকে ৪০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’’
এদিকে ক্যাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, থাইল্যান্ড প্রথমে তাদের ভূখণ্ডে অনধিকার প্রবেশ করেছে এবং আত্মরক্ষায় তারা জবাব দিয়েছে।
থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘এই পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমাদের আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’’
সম্প্রতি থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন শিনাওয়াত্রা, ক্যাম্বোডিয়ার সাবেক প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী হুন সেনকে ফোন করে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেন। তবে ফোনালাপের বিষয়বস্তু ফাঁস হয়ে গেলে তা থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং আদালতের রায়ে পায়েতংতার্ন সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত হন।
হুন সেন জানিয়েছেন, থাই সেনারা তাদের দুটি প্রদেশে গোলাবর্ষণ করেছে।
এই সীমান্ত বিরোধের ইতিহাস এক শতাব্দীর বেশি পুরনো। থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে বেশ কিছু এলাকা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত নয়, যার কারণে কয়েকবার সংঘর্ষ হয়েছে। ২০১১ সালে এমন একটি সংঘর্ষে এক সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছিল।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূচনা হয় মে মাসে, যখন এক ক্যাম্বোডিয়ান সেনা নিহত হন। এরপরই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয় এবং বর্তমানে তা সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
সুত্রঃ রয়টার্স