মাস্ক সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই-২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইউক্রেন যখন রুশ বাহিনীর দখল থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখল করতে জোরালো অভিযান চালাচ্ছিল, তখন ইলন মাস্ক স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন যার ফলে ইউক্রেনের সামরিক পরিকল্পনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় চালু হওয়া এই নেটওয়ার্কের ওপর কিয়েভের আস্থাও নষ্ট হয়।
রয়টার্স এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাস্ক ক্যালিফোর্নিয়ায় তার প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর এক শীর্ষ প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন, ইউক্রেনের খেরসনসহ একাধিক অঞ্চল যা রুশ অধিকৃত হলেও ইউক্রেনের পুনর্দখলের চেষ্টা চলছিল সেখানে যেন স্টারলিংক সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর একসঙ্গে শতাধিক স্টারলিংক টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায় এবং এগুলোর অবস্থান সংবলিত মানচিত্রে কালো হয়ে যায়।

স্টারলিংক বন্ধের স্থানগুলো অবস্থান মানচিত্রে কালো হিসেবে দেখানো হয়েছে। ছবিঃ রয়টার্স
ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে খেরসনের কাছে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনারা আকস্মিকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ড্রোনের নজরদারি বন্ধ হয়ে যায়, আর্টিলারি ইউনিটগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে, খেরসনের পূর্বে অবস্থিত বেরিস্লাভ শহরের একটি রুশ ঘাঁটি ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন অবশ্য বেরিস্লাভ ও খেরসন পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়। তবে ইলন মাস্কের এই হস্তক্ষেপ ছিল যুদ্ধের সময় স্টারলিংক বন্ধ করার প্রথম দৃষ্টান্ত, যা যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে। এমনকি স্টারলিংকের অনেক কর্মীও এই ঘটনায় বিস্মিত হয়েছিলেন।
এ ঘটনায় মাস্ক সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ ২০২৪ সালের মার্চেও এক্স (আগের টুইটার)-এ মাস্ক বলেছিলেন, “আমরা কখনোই এমন কিছু করিনি।”
এদিকে স্পেসএক্স দাবি করেছে, ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদনটি ভুল। তবে কোন অংশ ভুল তা স্পষ্ট করেনি। ইউক্রেন সরকারও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। যদিও ইউক্রেন এখনো স্টারলিংকের ওপর নির্ভর করে এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও মাস্ককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
মাস্ক কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আশঙ্কা করেছিলেন ইউক্রেনের অগ্রযাত্রা রাশিয়ার পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের একটির মতে, ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই বন্ধের ঘটনা ঘটে।
স্টারলিংক এখন বিশ্বজুড়ে ১৪০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এটি ২০২৫ সালে প্রায় ৯.৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্টারলিংকের এমন প্রভাবশালী অবস্থান এবং ইলন মাস্কের একক নিয়ন্ত্রণ অনেক দেশকেই চিন্তিত করে তুলেছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ও সাবেক টুইটার বোর্ড সদস্য মার্থা লেইন ফক্স বলেন, “মাস্কের একক নিয়ন্ত্রণ এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ঝুঁকি তৈরি করছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন এক ব্যক্তির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল।
মাস্ক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা রাজনৈতিক টানাপড়েনেও জড়িত। তিনি ট্রাম্পের সমর্থক হলেও পরে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নিজেই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, আবার বাইডেন প্রশাসনের ব্যয় পরিকল্পনাও খোলাখুলি সমালোচনা করছেন। এমনকি ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়েছেন, মাস্কের কোম্পানিগুলোর সরকারি চুক্তি বাতিল করা হবে।
যুদ্ধক্ষেত্রে স্টারলিংকের ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ইউক্রেনের সাবেক যুক্তরাজ্য দূত ভাদিম প্রিসতাইকো বলেন, “আমরা স্টারলিংক ছাড়া কিছুই করতে পারতাম না। এই প্রযুক্তি আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।”
প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, এমনকি দূরবর্তী এলাকাগুলোর সাধারণ সংযোগ রক্ষার ক্ষেত্রেও স্টারলিংকের বিকল্প খুবই সীমিত। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ছাড়াও ব্রিটিশ সেনা সদস্যরা এটি ব্যবহার করছে ‘ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য’।
সর্বশেষ, স্পেসএক্স জানিয়েছে, কিছু কাজে স্টারলিংক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে—যেমন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা। যদিও খেরসনে সেবা বন্ধের ঘটনাটি এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এখন বুঝতে পারছে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোতে বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির একচ্ছত্র আধিপত্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যেমনটি বলেছেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা মার্কাস উইলেট।তিনি বলেন, “সরকারগুলোকে এখন এটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে—একজন ব্যক্তির হাতে যখন জাতীয় নিরাপত্তার চাবিকাঠি থাকে, তখন কী হয়।”
সুত্রঃ রয়টার্স