রংপুরের তারাগঞ্জে গণপিটুনির আগে হাত জোড় করে এভাবে বাঁচার আকুতি জানান প্রদীপ লাল (বাঁয়ে)। নিজের পরিচয় বলছিলেন রূপলাল (ডানে)। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট- রংপুরের তারাগঞ্জে চোর সন্দেহে আটক রূপলাল দাস ও প্রদীপ লালকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে কয়েক শ মানুষের উপস্থিতিতে নির্মম এই হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেখানে পুলিশ ঘটনাস্থলে থেকেও তাঁদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫ মিনিট ২১ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রূপলাল ও প্রদীপকে একটি ভ্যানের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে, চারপাশে তরুণ-যুবকের ভিড়, আর পুলিশের চার সদস্য বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে ও হাত তুলে জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এনে একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়।
গত শনিবার রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জের সায়ার ইউনিয়নের বটতলা বুড়িরহাট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত রূপলাল দাস (৪০) উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা, পেশায় স্থানীয় বাজারে জুতা সেলাই করতেন। তাঁর আত্মীয় প্রদীপ লাল (৩৫) মিঠাপুকুরের ছড়ান বালুয়া গ্রামের বাসিন্দা, জীবিকা নির্বাহ করতেন ভ্যান চালিয়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ চলে যাওয়ার পর রূপলাল মাথা তুলতেই কালো গেঞ্জি পরা এক যুবক তাঁকে ঘুষি মেরে আবার ফেলে দেন। এরপর ভ্যানের ওপর শোয়া দুজনকে তরুণ-যুবকেরা লাঠি, রড, কিল, ঘুষি ও লাথি দিয়ে এলোপাতাড়ি আক্রমণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রদীপ মাটিতে পড়ে গেলে তাঁকেও অনবরত লাথি মারা হয়। রূপলালকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় প্রদীপের ওপর উল্টে দেওয়া হয়, ফলে দুজনই ভ্যানের নিচে চাপা পড়েন। কয়েকজন যুবক তখন ভ্যানের ওপর চাপ দিতে থাকে, আর আশপাশের কেউ কেউ চিৎকার করে বলতে থাকে, “এ মরে নাই এ্যালাও, দে দে চাপা দে।”
এরপর ভ্যান সরিয়ে এনে রশি, জুতা, গাছের ডাল ও ভ্যানের প্যাডেল দিয়ে আবার মারধর শুরু হয়। রূপলাল ও প্রদীপ তখন নিস্তেজ হয়ে পড়লেও আক্রমণ থামে না। হলুদ ও কালো গেঞ্জি পরা কয়েকজন তরুণ রূপলালের পিঠে বারবার লাথি মারে। প্রদীপকে দেখিয়ে এক যুবক চিৎকার করে বলে, “মার, নড়ি পা** ঢুকি দেও,” আর এই কথার সঙ্গে সঙ্গে গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করা হয়। ছাইরঙা গেঞ্জি পরা এক যুবক রূপলালের গলায় পা তুলে দেন মৃত্যু নিশ্চিত করতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, ঘটনাস্থলে ১৫-২০ জন তরুণ-যুবক এই বর্বর হামলার নেতৃত্ব দেয়। প্রথমে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে ভয়ে সরে যায়। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি এলে ততক্ষণে রূপলাল ঘটনাস্থলেই মারা যান, আর উপস্থিত লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।