খেলাপি ঋণে এশিয়ায় শীর্ষে এখন বাংলাদেশ । ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ সেপ্টেম্বর- বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ শতাংশে। অর্থাৎ বর্তমানে বিতরণ করা ঋণের প্রায় চার ভাগের এক ভাগের বেশি আদায়যোগ্য নয়। আর এ কারণে খেলাপি ঋণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন এশিয়ার শীর্ষ দেশ।
সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক খাত নিয়ে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ বাংলাদেশে।
গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের লুকানো খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ঋণও ব্যাপকভাবে খেলাপি হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এর পেছনে আছে দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ হিসাব করার নতুন নিয়ম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী এ বিষয়ে বলেন—
“আগে নানা ছলচাতুরীর কারণে খেলাপি ঋণ অনেকটা কম দেখানো হতো। সহজে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করার কারণেও প্রকৃত চিত্র আড়ালে থাকত। এখন আন্তর্জাতিক নিয়মে ঋণের মান নির্ধারণ করা হচ্ছে। ব্যবসায় মন্দা আর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেকের ব্যবসা খারাপ হয়ে পড়ায় খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে।”
তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ এভাবে বাড়তে থাকলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এডিবির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৩ সালের শেষে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯.৬ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের শেষে এ হার দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ২৭.০৯ শতাংশ। এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়—
- ভারতের খেলাপি ঋণ ২০২০ সালে ৭.৯% থেকে কমে ২০২৩ সালে হয়েছে ১.৭%।
- ভুটানের খেলাপি ঋণ ২০২০ সালে ১১.৭% থেকে কমে ২০২২ সালে হয়েছে ৩%।
- মালদ্বীপের খেলাপি ঋণ ১৮.৮% থেকে নেমে হয়েছে ৮.৩%।
- বিপরীতে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণ বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণের হার চীনের তাইপে (০.১%) ও দক্ষিণ কোরিয়ায় (০.২%)। আর বাংলাদেশের পরেই আছে কিরগিজস্তান, যদিও দেশটির হার এখন কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কিছু ব্যাংকে প্রকৃত ঋণের চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষত চট্টগ্রামের আলোচিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়ার পর তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে—
- ইসলামী ব্যাংক
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
- ইউনিয়ন ব্যাংক
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
- এক্সিম ব্যাংক
এই পাঁচটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া সরকারি খাতের অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক, এবং বেসরকারি খাতের আইএফআইসি, ইউসিবি, এনআরবি ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে।
জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১,৪০০ প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়মিত করার প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন নীতিমালার আওতায় ঋণগ্রহীতারা ১% অর্থ জমা দিয়ে ঋণ পুনর্গঠন করতে পারবেন। তবে ওই সময়ে তাদের সুদ পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই নীতিমালা কার্যকর হলে খেলাপি ঋণ কিছুটা হলেও কমতে পারে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এরপর থেকে তা ক্রমেই বেড়েছে। অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এখন সেসব ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আসছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের আর্থিক খাত ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে। তাই এখনই ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।