প্রতিটি আন্দোলনের শুরু হয়েছিল নির্দিষ্ট কোনো অসন্তোষ থেকে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর- ২০২২ সালে জনরোষে কেঁপে ওঠে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। সে সময় প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দুই বছর পর বাংলাদেশে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, যেখানে আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয় সরকার। আর মাত্র এক সপ্তাহ আগে নেপালে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে একদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ঘটায়।
প্রতিটি আন্দোলনের শুরু হয়েছিল নির্দিষ্ট কোনো অসন্তোষ থেকে, যা শেষ পর্যন্ত সরকার বা নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এ তিন দেশের আন্দোলনের অভিন্ন সূত্র হলো— শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জনঅসন্তোষ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও বৈষম্যমূলক মনে হওয়া।
প্রধানত তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনগুলো প্রাণঘাতী সহিংসতা সৃষ্টি করেছে, অনেক সময় রেখে গেছে অগণতান্ত্রিক শূন্যতা এবং আইনের শাসন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, “শাসকগোষ্ঠীকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ভবিষ্যতের কার্যকর পথ নির্ধারণে অক্ষম বলে মনে করা জনঅসন্তোষকে কাঠামোগত সংকটে রূপ দিয়েছে।”
অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার বিস্তার
শুধু এই তিন দেশেই নয়, প্রতিবেশী আরও কয়েকটি দেশেও সাম্প্রতিক সময়ে গণঅভ্যুত্থান দেখা গেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আন্দোলনে অন্তত সাতজন নিহত হন। চাপের মুখে প্রেসিডেন্টকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা মন্ত্রী পরিবর্তন করতে হয়।
মিয়ানমারে ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানে অং সান সু চি-র নির্বাচিত সরকার অপসারিত হয়, যার পর থেকে দেশটি গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত।
তিমুর লেস্তেতে সম্প্রতি এমপিদের জন্য ৬৫টি নতুন গাড়ি কেনার পরিকল্পনায় জনগণ রাস্তায় নামে। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের বাইরে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মতো নাটকীয় পরিণতি বেশিরভাগ আন্দোলনে না হলেও “ভুল হিসাব ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে উসকে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি রয়েছে।”
নেপালে গনঅভ্যুত্থান
নেপালে সাম্প্রতিক যুবনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় সরকারের প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানরা বিলাসী জীবনযাপন করলেও সাধারণ মানুষ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির শিকার হওয়ায় ক্ষোভ তীব্র হয়।
সহিংসতায় অন্তত ৭২ জন নিহত হন। সংসদ ভবন, প্রেসিডেন্ট হাউস ও মন্ত্রীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। জনচাপে প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ ওলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পদত্যাগ করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী মার্চে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০০৬ সালে রাজতন্ত্র বিলোপের পর থেকেই নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের সংবিধানের পর থেকে কোনো প্রধানমন্ত্রী এক বা দুই বছরের বেশি টিকতে পারেননি।
স্ট্যানিল্যান্ড মনে করেন, সহিংসতা আরও বাড়লে “কে নেতৃত্ব দেবে বা কীভাবে এগোনো উচিত” তা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা
নেপালের ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা থেকে আশার আলো পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটার নিয়ম নিয়ে ক্ষোভ থেকে। পরে তা রূপ নেয় সারাদেশব্যাপী আন্দোলনে। শত শত মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছাত্র। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ভারতে পালিয়ে যান। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। নতুন নির্বাচন এপ্রিল ২০২৬-এ হওয়ার কথা। কিন্তু এর মধ্যেই রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ও অস্থিরতা বাড়ছে।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে রাজাপাকসে পরিবারের পতনের পর প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ক্ষমতা নেন। পরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ২০২৪ সালে মার্কসবাদী সংসদ সদস্য অনুর কুমার দিসানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি দুর্নীতি দমন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মানবাধিকার সংকট ও বৈদেশিক ঋণখেলাপি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।
স্ট্যানিল্যান্ডের মতে, নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অস্থিতিশীল রাজনীতির প্রতীক।
সুত্রঃ এবিসি নিউজ। অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা