মেলবোর্ন, ২২ সেপ্টেম্বর– যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা রবিবার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সূত্রে জানা যায়, ফ্রান্সসহ আর কয়েকটি দেশেরও অদূর ভবিষ্যতে একই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থাকে — এই স্বীকৃতির বাস্তব প্রভাব কোথায়, এবং এতে আসলে কী কী পরিবর্তন হবে?
স্বীকৃতির অর্থ কী?
ফিলিস্তিন একরকম “আধা-রাষ্ট্র” — আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার স্বীকৃতি অনেক, বিদেশে কূটনৈতিক মিশন রয়েছে, এবং অলিম্পিকসহ ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করে। তবে বাস্তবে—ইন্তেজাম ও নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে—পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা জুড়ে তার কোনো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সীমান্ত, স্থায়ী রাজধানী বা একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনী নেই। গাজায় ২০০৭ সাল থেকে হামাস এককভাবে শাসন করছে। সেই কারণে কোনো দেশের স্বীকৃতি এখন মূলত প্রতীকী ও নৈতিক বলে ধরা হচ্ছে — তা আন্তর্জাতিকভাবে বড় রাজনৈতিক সংকেত পাঠায়, কিন্তু প্রতিদিনের বাস্তব জীবনে তা তাত্ক্ষণিক বড় পরিবর্তন ঘটাবে না।
তা হলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
প্রতীকী গুরুত্ব অনেক, কিন্তু কার্যকর প্রভাব সীমিত। তবু কিছু বাস্তব দিয়ে দেখা গেছে যে:
- কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। পশ্চিমা কোনো মূলধারার দেশের স্বীকৃতি হলে ফিলিস্তিনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক মর্যাদা শক্তিশালী হয়।
- জাতিসংঘে অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর যোগসা—ফিলিস্তিনকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে সমর্থন পেতে সহায়তা করতে পারে; চীন ও রাশিয়া আগে থেকেই স্বীকৃতি দিয়েছে।
- ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ও প্রত্যুত্তর। ইসরায়েল ও তার মিত্ররা বলেন—এ ধরনের স্বীকৃতি হামাসের ‘পুরস্কার’ হবে এবং সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে কৌশলগত জটিলতা বাড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রও এর কড়া আপত্তি জানিয়েছে; ফলে কূটনৈতিক চাপ ও প্রতিক্রিয়া বাড়ার সম্ভাবনা আছে।
- মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণে বদল নয়। পশ্চিম তীরের বিস্তৃত অংশে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন (জায়গা দখল) প্রচলিত থাকায় এবং ২০২০ সালের তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র ধরনের চুক্তি না থাকার কারণে স্বীকৃতি একা-এখানে কোনো সীমান্তগত বা প্রশাসনিক বদল আনতে পারবে না।
- মানবিক পরিস্থিতি ও চাপ বৃদ্ধি। গাজার দুর্ভিক্ষ, নিরস্ত্র নাগরিকদের দুর্দশা এবং আন্তর্জাতিক জনমতের চাপ দেশগুলোকে দ্রুত স্বীকৃতি দিতে প্ররোচিত করেছে — যা ভবিষ্যতে সাহায্য ও পুনর্গঠন তহবিল, মানবিক প্রবেশাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৩টি জাতিসংঘ সদস্যদের প্রায় ৭৫ শতাংশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; ১৯৮৮ সালে চীন ও রাশিয়া ইতিমধ্যে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন আংশিক সমর্থন সত্ত্বেও (প্রধানত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কারণে) সরাসরি পূর্ণ স্বীকৃতির পক্ষে ছিল না—বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আমেরিকার নীতি ইসরায়েল-মোদী হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক কালে জনমত ও গাজার মানবিক চিত্রের কারণে পশ্চিমা দেশে নীতিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের স্বীকৃতি হামাসকে উৎসাহ দিতে পারে — এবং তাই ক্ষতিকর। মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা বিরোধী ছিলেন, তারা স্বীকার করেছেন যে এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে এবং দ্বিপক্ষীয় শান্তি উদ্যোগকে ক্ষুন্ন করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা সতর্কভাবেই বলছেন, এককভাবে বা শুধুই প্রতীকী কারণে করলে শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রধান পরিণতি এখনই রাজনৈতিক ও নৈতিক: এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনের অবস্থান দৃঢ় করে, পাকিস্তানীয়/আরব বিশ্বের এবং বৃহৎ জনমতের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা—সীমান্ত, দখল, সরকারের কার্যক্ষমতা—বর্তমানেই একরকম অপরিবর্তিত থেকেই যাবে, যতদিন না ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও সম্মিলিত শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত হয়।
সুত্রঃবিবিসি