সম্প্রতি কমিটি গঠন নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ নভেম্বর- ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় ৭ নভেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার বিকেলে পৌর সদর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে প্রায় ২০টি মোটরসাইকেলে। একটি শপিং কমপ্লেক্সও ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে দুই ভাগে বিভক্ত। একপক্ষে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার নাসিরুল ইসলামের সমর্থকরা, অন্যপক্ষে উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন মিয়া ঝুনুর অনুসারীরা। সম্প্রতি কমিটি গঠন নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।
সংঘর্ষের সূচনা ও বিস্তার
৭ নভেম্বর উপলক্ষে দুই পক্ষ আলাদা কর্মসূচি ঘোষণা করে। সকাল থেকেই দুই দলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিতে শুরু করেন, আর বোয়ালমারী থানা পুলিশ সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে। বিকেল ৪টার দিকে উভয় পক্ষ মিছিল নিয়ে শহরে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
খন্দকার নাসিরুল ইসলামের সমর্থকরা মহিলা কলেজের মোড়ে এবং ঝুনু মিয়ার গ্রুপ ওয়াপদা মোড়ের কাজী হারুন শপিং কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থান নেয়। দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয় এবং দ্রুত তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পুলিশের পিছু হটার পর ঝুনু মিয়ার সমর্থকরা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে মোটরসাইকেলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এরপর আরও কয়েকটি এলাকায় একইভাবে মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়।
শপিং কমপ্লেক্সের দোকানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জের মাধ্যমে ভাঙচুর চালানো হয়। আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, কিন্তু বিএনপির কর্মীরা তাদের ফিরিয়ে দেয় বলে জানা গেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা তাণ্ডব চলার পর মাগরিবের নামাজের পর পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আহত ও ক্ষয়ক্ষতি
সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে লিয়াকত হোসেন, মিনহাজুর রহমান লিপন ও রফিকুল ইসলামকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও আটজন।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
শামসুদ্দিন মিয়া ঝুনু বলেন, “নাসিরুল ইসলামের লোকজন বহিরাগত ভাড়া করে এনে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছে। অফিস ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমাদের নেতাকর্মীদের মারধর করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।”
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, “ঝুনু মিয়ার অনুসারীরাই আগে হামলা করে। তারা সালথা ও নগরকান্দা থেকে লোক ভাড়া করে এনেছিল। তারাই প্রথম মোটরসাইকেলে আগুন দেয়। আমরা বিষয়টি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানাব।”
বোয়ালমারী থানার ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, “বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে।”
কমিটি ও মনোনয়ন নিয়ে বিরোধের পটভূমি
ফরিদপুর-১ আসনের অন্তর্ভুক্ত এই উপজেলায় মনোনয়নপ্রত্যাশী খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ও শামসুদ্দিন মিয়া ঝুনুর মধ্যে প্রতিযোগিতা বহুদিনের। বিএনপি সম্প্রতি ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও ফরিদপুর-১-এ এখনও কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। গত ২৩ অক্টোবর গঠিত উপজেলা ও পৌর বিএনপির নতুন কমিটিতে নাসিরুলের অনুসারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থান পায়, ঝুনু মিয়ার পক্ষ থেকে মাত্র কয়েকজন ঠাঁই পান। এরপর থেকেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং শুক্রবার প্রথমবার সরাসরি সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ।
সংবাদ সম্মেলন ও নতুন অভিযোগ
সংঘর্ষের পর সন্ধ্যায় সাতৈর বাজারে খন্দকার নাসিরুল ইসলামের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তার অনুসারীরা। উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমাদের বিকেলের কর্মসূচিতে তারা পূর্ব পরিকল্পনা করে হামলা চালিয়েছে। তাদের মিছিল থেকে জয় বাংলা ও নারায়ে তাকবির স্লোগান দেওয়া হয়, যা আমাদের সভা ভাঙার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহা, পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস শেখ, সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান হোসেনসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। এখন সবার দৃষ্টি দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে, যা এই সংঘর্ষের পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারণ করবে।
সুত্রঃ সমকাল