আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ নভেম্বর: রবিবার সকালটা বাংলাদেশে অন্য দিনের মতো ছিল না। সাধারণত যে রাস্তাগুলো যানবাহন আর মানুষের কোলাহলে মুখর থাকে, সেগুলো ছিল অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ। দোকানপাট দেরিতে খুলেছে, গণপরিবহন ছিল সতর্ক, আর অনেক মানুষ ঘর থেকে বের হননি। দেশের ওপর যেন এক ধরনের অজানা উদ্বেগ ছায়া ফেলেছে—কারণ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আসন্ন রায় ঘোষণা হতে চলেছে।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ঘটনাগুলোর সঙ্গেই যুক্ত এই মামলাটি। সেই সময় রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে হাজারো ছাত্র রাস্তায় নেমেছিল, সহিংস সংঘর্ষ ছড়িয়েছিল বিভিন্ন শহরে, এবং দেশজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনা এসব মানবতাবিরোধী অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তবু চূড়ান্ত রায় ঘনিয়ে আসতেই দেশজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছে।
রায়ের আগে নিরাপত্তা জোরদারে সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। ঢাকাজুড়ে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট, আর জনসমাগম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবুও রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় আতশবাজির শব্দ শোনা গেছে।
এদিকে, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দুই দিনের দেশব্যাপী শাটডাউন ঘোষণা করেছে। দলটির সব রাজনৈতিক কার্যক্রম ও সংগঠনগুলোর কার্যক্রম ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করায় আওয়ামী লীগের নেতারা এখন অজ্ঞাত স্থান থেকে সামাজিক মাধ্যমে বিবৃতি দিচ্ছেন। রায়ের আগে তাদের অনলাইন সক্রিয়তা আরও বেড়েছে।
ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছে, এই অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান। তিনি বললেন,
“এই পরিস্থিতি কারও জন্যই স্বস্তিদায়ক নয়। মানুষ ভীত। আমরা শুধু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। এখন ব্যবসা, সমাজ সবই অস্থির।”
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া মনিরুজ্জামান মনে করেন, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন দেশের জন্য নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
“আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি চাই, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চাই। আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। এই অঞ্চলের শান্তি বাংলাদেশকেও টিকিয়ে রাখবে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
“ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের সাহায্য করেছে। আমি সেখানেই প্রশিক্ষণ নিয়েছি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। আমরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চাই, তবে আমাদের নিজস্ব পরিচয়ও রক্ষা করতে হবে।”
মনিরুজ্জামান সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশের পোশাক শিল্প নিয়ে যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ।
“এই খাতই দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনে। অস্থিরতা বাড়লে বিদেশি ক্রেতারা আস্থা হারাবে। তখন পুরো দেশের ওপর তার প্রভাব পড়বে।”
তার মতে, দেশের ভেতরে বিভেদ কমিয়ে সাধারণ পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
“আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘুতে বিশ্বাস করি না। আমরা সবাই বাংলাদেশি এটাই আমাদের পরিচয় হওয়া উচিত।”
দ্য স্টেটমেন্ট এর প্রতিবেদন অবলম্বনে