জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসভিত্তিক তিন শতাধিক আলোকচিত্র, বই, স্মরণিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত কাঠের ভাঙা বন্দুক, তাঁদের পরিধেয় পোশাক, রান্নার পাতিলসহ নানা উপকরণ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ ডিসেম্বর- মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং স্থানীয় ইতিহাসের মূল্যবান দলিলপত্রে সমৃদ্ধ বরগুনা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এখন খালি পড়ে আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর জাদুঘরের কক্ষ তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। লুট হওয়া সামগ্রী ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও এখনো কিছুই ফিরে আসেনি।
জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসভিত্তিক তিন শতাধিক আলোকচিত্র, বই, স্মরণিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত কাঠের ভাঙা বন্দুক, তাঁদের পরিধেয় পোশাক, রান্নার পাতিলসহ নানা উপকরণ। পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বরগুনায় স্থাপিত মোগল আমলের ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের অংশ এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে অবস্থিত মজিদবাড়িয়া মসজিদের ইটপাথরের অংশও ছিল এখানে।
নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে ১৯৯৫ সালে স্থানীয় সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আলোকচিত্র সংগ্রহ ও প্রদর্শনী দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পরে এটি জেলা প্রশাসনের জাতীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৩ সালে জেলা শিল্পকলা একাডেমির নিচতলার একটি কক্ষে মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি হিসেবে কার্যক্রম শুরু হলে ধীরে ধীরে এটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপ নেয়। ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘোষণা করা হয়। জাতীয় দিবসগুলোতে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
জাদুঘরের ট্রাস্টি সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী চিত্তরঞ্জন শীল জানান, ১৯৮৫–৮৬ সালের দিকে কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক ও কর্মী মুক্তিযুদ্ধ ও প্রত্নতত্ত্বের ছবির প্রদর্শনী শুরু করেন। পরে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট সদস্যরা উদ্যোগে যুক্ত হন। জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালেও বরগুনার এই উদ্যোগে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেছে। তিনি বলেন, জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও স্থানীয় ইতিহাসের দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দলিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পুরোনো রেডিও ও টেলিভিশনসহ নানা জিনিস সংরক্ষণ করা ছিল।
এ ছাড়া ছিল বেতাগী শাহি মসজিদ ও মজিদবাড়িয়া মসজিদের ইট, ঐতিহাসিক মন্দিরের স্মৃতিচিহ্ন, ১৯৯০ সালে তালতলীর জয়ালভাঙ্গায় পাওয়া ৪৮ ফুট দৈর্ঘ্যের তিমি মাছের হাড়, বিভিন্ন দেশের প্রায় হাজারখানেক ধাতব ও কাগজের মুদ্রা।
হামলার সময়কার দৃশ্য বর্ণনা করতে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা কাচঘেরা প্রতিটি টেবিল ভেঙে ফেলে এবং বিভিন্ন নিদর্শন লুট করে। অনেক দলিলপত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করা হয়। জাদুঘরের মাইকও ভেঙে ফেলা হয়। অবশিষ্ট জিনিসপত্র যে যেভাবে পারে নিয়ে যায়।
ঘটনার তিন দিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি দল জাদুঘরটি পরিদর্শনে যায়। তারা ক্ষতিগ্রস্ত উপকরণগুলো যতটা সম্ভব সংরক্ষণের চেষ্টা শুরু করে। তবে এখন পর্যন্ত লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার হয়নি।
বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক ইউসুপ মৃধা বলেন, জাদুঘরটি নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের উচিত দ্রুত জাদুঘরটি পুনর্গঠন করা এবং লুট হওয়া দলিলপত্র উদ্ধার করা।
জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোনে কথা বলেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ দৈনিক সমকাল