বাংলাদেশ

খালেদা জিয়া: রাজনৈতিক উত্থান, অর্জন এবং ভুল সিদ্ধান্ত

  • 6:18 am - December 03, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৪২ বার
২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় এক অনুষ্ঠোনে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এটিই ছিল দুজনের মধ্যে সর্বশেষ সাক্ষাৎ। ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ৩ ডিসেম্বর- ১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়া তখন সম্পূর্ণ রাজনীতির বাইরে থাকা একজন গৃহবধূ। রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেতো না। স্বামী হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, কিন্তু পরে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ স্বৈরশাসন কায়েম করেন। বিএনপির ভেতরে তখন দলীয় কোন্দল, ভাঙন, নেতাদের এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া ইত্যাদিতে দলটি দিশেহারা হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় দলের সিনিয়র নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করলেও এটিকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন খালেদা জিয়া, বিশেষ করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়। সেই আন্দোলন তাকে দেশের মানুষের সামনে ব্যাপক পরিচিত করে তোলে এবং বিএনপিকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করায়।

এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে মাত্র দশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। আন্দোলনের সময় কয়েকবার গ্রেপ্তার হলেও তিনি পথ থেকে সরে যাননি। বিএনপির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানের মতে, তিনি দৃঢ় মানসিকতার মানুষ এবং সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া। ছবিঃ বিবিসি

সফলতা ও অবদান

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ এই দুই মেয়াদে তিনি পূর্ণ সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথম মেয়াদে সংসদে নবীন ও প্রশাসনে অনভিজ্ঞ হলেও পাঁচটি আসন থেকে লড়ে পাঁচটিতেই জয় পান। তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে কোনো নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষাবিদ ড. সাঈদ ইফতেখার আহমদের মতে, তার প্রথম মেয়াদে দুর্নীতি বিশেষ বিস্তার পায়নি এবং নারীর অগ্রগতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল রাষ্ট্রে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং নারী অধিকার বিষয়ে ভূমিকা রাখা তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

রাজনৈতিক ভুল এবং সমালোচনা

২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিকে প্রগতিশীল ধারা থেকে দূরে যেতে দেখা যায়। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে আপসের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপি ও খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন। ওই সময় জামায়াতে ইসলামীকে সরকারে নেওয়া, দলের ভেতরে টানাপোড়েন, দুর্নীতির অভিযোগ, ক্ষমতার আড়ালে কিছু দুর্বৃত্তচক্রের প্রভাব—এসব বিষয় তার ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মতে, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির মুখে সংসদ ভেঙে আগাম নির্বাচন দিলে বিএনপি বেশি জনপ্রিয়তা নিয়ে ফিরতে পারতো। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর অবস্থান না নেওয়া এবং তারেক রহমানকে খুব দ্রুত শীর্ষ নেতৃত্বে তুলে আনা বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার দায় বিএনপির ওপর রাজনৈতিকভাবে বড় আঘাত আনে। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। মেয়াদশেষে দল ছাড়েন অলি আহমদ। ২০০৭ সালে মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়াকে বহিষ্কার করাও দলকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি কঠিন চাপে পড়ে। এরপর দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার কারাবাস দলের জন্য আরেক বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।

আদালত চত্বরে খালেদা জিয়া। ছবিঃ বিবিসি

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি

রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যু তার ব্যক্তিজীবনে গভীর আঘাত আনে। রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যেই এই শোক তাকে আরও দুর্বল করে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যত

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবন্দী ছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার শারীরিক অবস্থা গুরুতরভাবে অবনতির দিকে গেছে। তিনি এখন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। লিভারের জটিলতা, কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণসহ একাধিক সমস্যায় তিনি সংকটজনক অবস্থায় রয়েছেন। তার চিকিৎসায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হয়েছেন। চীনের পাঁচ সদস্যের একটি টিম ইতোমধ্যেই ঢাকায় এসে চিকিৎসায় অংশ নিয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তার অবস্থা স্থিতিশীল হলেও এখনও গুরুতর। দলের নেতারা নিয়মিতভাবে পরিবারের সঙ্গে চিকিৎসা আপডেট নিচ্ছেন এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

সরকারিভাবে ভিভিআইপি ঘোষণা

খালেদা জিয়া বর্তমানে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এরপর ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর খালেদা জিয়াকে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ভিভিআইপি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তার নিরাপত্তায় স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স আইন ২০২১ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। চিকিৎসা, চলাচল এবং অবস্থান ঘিরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এভারকেয়ার হাসপাতালেও ইতোমধ্যেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খবর নিতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে আসছেন বিএনপির নেতা–কর্মীরা। ছবিঃ সংগৃহীত

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মতভেদ

মাহফুজ উল্লাহ মনে করেন, বিএনপির ভাঙন হয়নি এবং অতীতের তুলনায় পার্টি এখনও সংগঠিত। তাই তিনি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ নন।

অন্যদিকে ড. সাঈদ ইফতেখার আহমদ মনে করেন, যদি বিএনপি তার মুক্তির দাবিতে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ খুবই অনিশ্চিত।

সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল উত্থান, সাফল্য, বিতর্ক, ভুল, সংকট এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে ভরা। বর্তমান সময়ে তার শারীরিক অবস্থা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দুটোই অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে আছে।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

এই শাখার আরও খবর

ইরানের রাডার স্থাপনায় মার্কিন হামলার দাবি, নতুন করে উত্তেজনা

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়,…

জনতার জবানবন্দি: ইউনূস সরকারের  ১৮ মাসের দুঃশাসনে জাতি যা হারিয়েছিল

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত—৫৪৭ দিন। ইউনূস সরকার এই ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে দুঃশাসন চালিয়েছিল। “সংস্কার” এর নামে…

কোন পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উভয়…

ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়ে সান মারিনোকে হারালো বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে…

আইভীর মুক্তি: আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত নাকি নতুন সমীকরণ?

মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিএনপি সরকার সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন জামিন দিলো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে আদালত জামিন দেয় না, জামিন দেয় যারা সরকারে থাকে। তো, আইভীকে কেন…

সৌদি আরবে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল জামালপুরের প্রবাসী যুবক শামীমের

মেলবোর্ন,০৬জুন-সৌদি আরবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার এক বাংলাদেশি প্রবাসী যুবক। নিহত শামীম হোসেন (৩২) উপজেলার মহাদান ইউনিয়নের খাগুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং আব্দুস…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au