মেলবোর্ন, ১৪ ডিসেম্বর- আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি এক গভীর শোক ও বেদনার দিন। স্বাধীনতার একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যে জাতি বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিল, সেই মুহূর্তেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিসেবীদের হারিয়ে জাতি সেদিন মেধাশূন্য হয়ে পড়েছিল। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস তাই শুধু স্মরণের নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ পথচলার প্রশ্নও সামনে আনে।
এ বছর ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। দীর্ঘ ১৬ মাস পর বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষিত হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের মাধ্যমে দেশ নতুন এক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রক্রিয়া এগিয়েছে, তাকে একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন অনেকেই।
এই বাস্তবতায় এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস শুধু অতীতের শোক নয়, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পৃথক বাণীতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা ইতিহাসের এক ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে যখন বিজয় নিশ্চিত, ঠিক তখনই স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাহীন করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দুই দিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর রাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তালিকা ধরে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়। চোখ বেঁধে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের অপহরণ করা হয়। পরদিন সকালে মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলায় পাওয়া যায় তাঁদের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। বুলেটবিদ্ধ, বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত সেই দেহগুলো ছিল বাঙালির সংস্কৃতি ও বিবেক হত্যার নির্মম প্রমাণ।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আরও আগে, ১০ ডিসেম্বর থেকেই। তালিকা তৈরি করে তা আলবদর ও আলশামস বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলি। মূল লক্ষ্য ছিল সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে নেতৃত্বশূন্য ও মেধাশূন্য করে ফেলা।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আজ সারাদেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিভিন্ন সংগঠন রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাবেন।
দিনব্যাপী মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। গণমাধ্যমগুলো প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠান ও নিবন্ধ।
রাজনৈতিক দলগুলোও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন আলোচনা সভা, শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস তাই শুধু অতীতের এক নির্মম অধ্যায়ের স্মরণ নয়। এটি জাতিকে মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা কতটা জরুরি। একাত্তরের সেই আত্মত্যাগ আজও প্রশ্ন তোলে, আমরা কি সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, নাকি সেই দায় এখনো আমাদের কাঁধেই রয়ে গেছে।