সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী
দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…
মেলবোর্ন, ১৮ ডিসেম্বর- নতুন ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ জারির পর সারা দেশের মফস্বলে কাজ করা প্রায় সাড়ে তিন হাজার সাংবাদিক নতুন করে সংকটে পড়েছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা এসব মানুষ বলছেন, নীতিমালার একটি বিধান কার্যকর হলে তাঁদের পেশাগত পরিচয় ও আয়ের পথ একসঙ্গে হুমকির মুখে পড়বে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তাঁরা।
গত ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন জনবল কাঠামো ও নীতিমালা জারি করে। এতে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি বা লাভজনক পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। কেউ এই বিধান অমান্য করলে তাঁর এমপিও বাতিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ হঠাৎ করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন।
নীতিমালা জারির পর থেকেই শিক্ষকসমাজে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে যারা গ্রাম ও মফস্বলে থেকে স্কুল বা কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা, অনলাইন নিউজপোর্টাল কিংবা টেলিভিশনের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেক জেলা ও উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও শিক্ষকতায় যুক্ত। তাঁদের ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ করে সমাজের স্বার্থে সাংবাদিকতার মতো কাজ করা অন্যায় বা দ্বৈত পেশা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ঠিক কতজন শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত, তার নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। তবে নীতিমালা জারির পর হোয়াটসঅ্যাপে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ নামে একটি গ্রুপ খোলা হয়েছে। মাত্র দুই দিনের মধ্যেই সেখানে প্রায় ৩০০ জন যুক্ত হয়েছেন। এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের আহ্বায়ক মাসুদ হাসান বাদল। তিনি শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক এবং একটি জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি। তাঁর দাবি, সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, এটিকে দ্বৈত পেশা বলা ঠিক নয়। অধিকাংশই নামমাত্র সম্মানী পান, কেউই বেতনভুক্ত নন। সম্মানী নেওয়া আইনসম্মত এবং সরকারি কর্মকর্তারাও নানা কাজে সম্মানী নিয়ে থাকেন। তাঁর প্রশ্ন, একজন শিক্ষক যদি জনপ্রতিনিধি হতে পারেন বা কাজি হতে পারেন, তাহলে সাংবাদিকতা করতে পারবেন না কেন।
মাদারীপুরে কর্মরত শিক্ষক ও সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম মনে করেন, এই নীতিমালা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, সরকারি চিকিৎসকেরা হাসপাতালের দায়িত্ব শেষে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখেন, অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষক দোকান, কৃষিকাজ বা টিউশনি করে আয় করেন। এগুলো যদি দোষের না হয়, তাহলে সাংবাদিকতাকে কেন নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। শিক্ষক-সাংবাদিক বাদল আহমেদের মতে, মফস্বলে সাংবাদিকতার মান এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে। শিক্ষক সমাজের একটি দক্ষ ও লেখালেখিতে পারদর্শী অংশ দীর্ঘদিন ধরে সততার সঙ্গে কাজ করে আসছেন। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে তাঁদের সেই সৃজনশীলতার পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
একই সুর শোনা গেছে শিক্ষক-সাংবাদিক সাইদুর রহমানের কথায়। তাঁর মতে, যোগ্য শিক্ষকরা যখন সংবাদ, ফিচার বা বিশ্লেষণ লেখেন, তখন তা সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বরং যারা সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা ছাড়াই তৃণমূলে এই পেশার নামে নানা অনিয়মে জড়ায়, তাদের নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি জরুরি।
নীতিমালা জারির পর মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমানের সই করা এক আদেশে জেলার সাত উপজেলার সব মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের আওতাধীন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে যারা সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় যুক্ত, তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে। মো. আতাউর রহমান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে সারা দেশে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় চার লাখ, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ হিসেবে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক সম্মেলনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্য পেশায় যুক্ত থাকার সুযোগ বন্ধ করার প্রস্তাব ওঠে। গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের মতবিনিময় সভায়ও এ দাবি পুনরায় তোলা হয়। সেখানে বলা হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা যদি সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র। কেউ কেউ নীতিমালাকে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকের আশঙ্কা, বাস্তবতা বিবেচনা না করে কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অসন্তোষ বাড়বে এবং স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, নীতিমালায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে একসঙ্গে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শিক্ষক-সাংবাদিকদের মধ্যে বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সূত্রঃ সমকাল
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au