বজ্রপাতে সাত জেলায় ৯ জনের মৃত্যু
মেলবোর্ন, ৩০ এপ্রিল- দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতের ঘটনায় একদিনেই সাত জেলায় অন্তত ৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) জামালপুর, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী, রংপুর, শরীয়তপুর…
মেলবোর্ন, ৩১ ডিসেম্বর- বাংলাদেশে চলমান গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ায় গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান। তাঁর মতে, এই অনিশ্চয়তা সমাজে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা তৈরি করছে, যা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরও জটিল করে তুলছে।
মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় কি-নোট বক্তা হিসেবে এসব কথা বলেন তিনি। ‘ওয়ার্ল্ড ডেমোক্রেসি কংগ্রেস’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন ছিল এটি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই সম্মেলনের আয়োজন করে গবেষণা সংস্থা পলিটিক্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন পিপিএসআরএফ।
আলোচনা শুরুর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তত তিনটি বড় রাজনৈতিক উত্তরণকাল অতিক্রম করেছে দেশ। এগুলো হলো ১৯৯০, ২০০৮ ও ২০২৪ সাল। তবে প্রতিবারই গণতন্ত্রকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে দেশের অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। তাঁর ভাষায়, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতারাও অল্প সময়ের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখিয়েছেন। এটি কেবল সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই এই ধারা বিদ্যমান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক উত্তরণের অনিশ্চয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। একটি বড় রাজনৈতিক দল এখনো কার্যত মাঠের বাইরে রয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়া বিএনপিও এখনো পুরোপুরি সংগঠিত অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এর ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
রাজনীতিতে দখলদারত্বের সংস্কৃতি প্রসঙ্গে রওনক জাহান বলেন, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন ও তহবিল সংগ্রহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করা হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়েছে। অথচ বাস্তবে রাজনৈতিক চর্চায় বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাঁর মতে, দখলদারত্বের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার বদলে শুধু নতুন দখলদাররা জায়গা করে নিয়েছে।
নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা সমস্যার সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উন্মুক্ত ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ থাকতে হবে। পাশাপাশি মধ্য বামপন্থী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিও এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, গত এক বছরে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা এখনো সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এই পরিবর্তন একজন নেতার মাধ্যমে আসবে না। বরং দেশ ও রাজনীতিকে নতুন পথে নিতে প্রয়োজন অঙ্গীকারবদ্ধ একদল নেতৃত্ব, যেখানে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজেরও সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ কখনোই বন্ধ করা যাবে না। এই পথ খোলা রাখতে হবে, যাতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ১৯৬২ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালে তিনি পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। সে সময়ের আন্দোলনের স্লোগানগুলো ছিল সামরিক শাসনবিরোধী, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে। তাঁর মতে, দুঃখজনকভাবে আজও বাংলাদেশ সেই একই দাবির জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরেন। মতিউর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের শাসনামলেই সংবাদপত্র শিল্প এবং প্রথম আলোর ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। মামলা, বিজ্ঞাপন বন্ধ, আর্থিক চাপ সৃষ্টি এবং নানা ধরনের হয়রানির মধ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪ সালে প্রথম আলোর মালিকানা ও সম্পাদক পরিবর্তনের চাপও তৈরি হয়েছিল। ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন হলেও বাস্তবে বাংলাদেশে কোনো সময়েই পূর্ণাঙ্গ অর্থে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পঞ্চাশের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক চর্চায় সংবাদপত্র এবং সুশীল সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে সেই ভূমিকা দৃশ্যমান নয়, যা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মতিউর রহমান আরও বলেন, ১৯৯১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো পরিকল্পিতভাবে সুশীল সমাজ ও সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এই প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারাও যুক্ত হয়েছেন। তিনি ২০২৪ সালের মার্চে প্রথম আলো বন্ধের দাবিতে আয়োজিত একটি সভায় তৎকালীন উপাচার্যের অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন।
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় দেশীয় পর্যায়ে সহমর্মিতা পাওয়া গেলেও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এতে বিনিয়োগ, ভিসা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথম আলোর লক্ষ্য একটাই উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জয় দেখতে চায় পত্রিকাটি। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন হতেই হবে, তবে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
আলোচনায় সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা রাজনীতিক হয়ে উঠেছেন। এর ফলে কোনো ক্ষেত্রই সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলেই বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা বদলাতে হলে সবাইকে জেগে উঠতে হবে।
ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়া সফল হোক, সেটিই নরওয়ের প্রত্যাশা। তিনি জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরওয়ে পর্যবেক্ষক পাঠাবে।
সমাপনী অধিবেশনে পিপিএসআরএফের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সমাপনী বক্তব্য দেন সদ্য সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এবারের সম্মেলনের জন্য জমা পড়া প্রায় ১৬৫টি গবেষণাপত্রের মধ্য থেকে বাছাই করে ৬৭টি প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত করা হয়। অনলাইনে প্রায় ২০টি দেশের প্রতিনিধিরাও এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au