আদালতে মাদুরোর ‘নাটকীয়’ শুনানি, যা যা ঘটল
মেলবোর্ন, ৬ জানুয়ারি- স্থানীয় সময় সোমবার দুপুরে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতের ২৬ তলার কক্ষে মাদুরোর প্রথম শুনানি শুরু হয়। এ সময় দর্শক আসনে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক, পাশাপাশি ছিলেন সাধারণ দর্শক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ডিইএ)-এর কয়েকজন কর্মকর্তা। শুনানির মামলাটি দায়ের করেছে ডিইএ।
শুধু তিন দিন আগেও ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে নিজের বিলাসবহুল প্রাসাদে সময় কাটিয়েছেন মাদুরো। এখন তিনি প্রেসিডেন্ট থেকে আসামিতে পরিণত হয়েছেন। আদালতে নেওয়ার সময় মাদুরোর পরনে ছিল কয়েদিদের নীল ও কমলা রঙের পোশাক। ফেডারেল আদালতের আইনপ্রয়োগকারী এজেন্সি ইউএস মার্শালের দুজন সদস্য তাঁকে কক্ষে নিয়ে আসেন। ভেতরে ঢুকেই তিনি কয়েকজনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান এবং তিন থেকে চারবার ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে শুভেচ্ছা জানান। পাশে বসা ইউএস মার্শালের সদস্য ও তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে করমর্দনও করেন।

আদালতে নেওয়ার আগে হেলিপোর্টে হাতকড়া পরানো অবস্থায় নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস (ডানে)। ছবি: GC Images
আদালতের কক্ষে মাদুরোর দুই আসন পরে বসেছিলেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস, যিনি মামলায় অভিযুক্ত। তাঁর ডান চোখের পাশে ছিল ব্যান্ডেজ, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে তিনি আঘাত পেয়েছেন।
ফেডারেল আদালতের শুনানি সাধারণত গুরুগম্ভীর হয়, কিন্তু সোমবারের পরিবেশ মোটেও তা ছিল না। মাদুরো প্রতিটি সুযোগ ব্যবহার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। জোর দিয়ে বলেন, তিনি এখনও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে বিচারক মাদুরোকে পরিচয় নিশ্চিত করতে বললেও তিনি নিজের নাম উল্লেখ না করে বলছিলেন, তাকে ‘ধরে আনা’ বা ‘অপহরণ’ করা হয়েছে। তখন বিচারক তাঁকে থামিয়ে শুধু নিজের নাম বলার নির্দেশ দেন।
শুনানি শুরুর আগে আদালতের এক কর্মচারী দর্শকদের সতর্ক করেছিলেন, পুরো সময় নীরব থাকতে হবে এবং আসামির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা যাবে না। কিন্তু শুনানির শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইউএস মার্শালরা যখন মাদুরোকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একজন ব্যক্তি গ্যালারিতে উঠে স্প্যানিশ ভাষায় চিৎকার শুরু করেন। মাদুরোর সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় এবং মাদুরো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।

পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তির নাম পেদ্রো রোহাস (৩৩)। তিনি ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলা থেকে নির্বাসিত হন। আদালতের বাইরে স্কাই নিউজকে তিনি জানান, নির্বাসিত হওয়ার আগে তিনি চার মাস রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাস করছেন। রোহাস বলেন, “আমি মাদুরোকে আগেও বলেছি, তাকে মূল্য দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করবে। আজ (৫ জানুয়ারি) তাই হলো। ভেনেজুয়েলার সোনালি যুগ শুরু হয়েছে।”
মাদুরোর সঙ্গে কি নিয়ে বাক্য বিনিময় হয়েছে জানতে চাইলে রোহাস বলেন, “তিনি নিজেকে নির্দোষ ও ‘ম্যান অব গড’ বলেছেন। আমি তাঁকে বলেছি, আমরাও ম্যান অব গড। কারণ আমরা কখনো ভেনেজুয়েলার চার্চে হামলা করিনি। এই কাজ তিনি বহুবার করেছেন।”
শুনানি শেষ হওয়ার পর একটি মোটরকেডে করে মাদুরোকে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়েছে মার্চ মাসে।
এদিন আদালতে নিকোলাস মাদুরো তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। একইসঙ্গে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও নিজেকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেন। নিউইয়র্কের ফেডারেল বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইনের এজলাসে শুনানির সময় তাদের কনস্যুলার সহায়তার অধিকার জানানো হয় এবং দুজনেই কনস্যুলার সাক্ষাতের আবেদন করেন। তবে আপাতত কেউই জামিনের আবেদন করেননি।

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মার্কিন প্রসিকিউটররা মাদুরোর বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অভিযোগ এনেছেন, যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত কথিত ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারে সহায়তা করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে।
আদালতে নিজ বক্তব্যে মাদুরো বলেন, “আমি নির্দোষ। আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি একজন ভদ্র মানুষ এবং এখনও আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।” তিনি আরও দাবি করেন, তাকে ভেনেজুয়েলা থেকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত শনিবার রাতে একটি বিশেষ অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে কারাকাস থেকে আটক করা হয়। অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা অংশ নেয়। বর্তমানে তারা ব্রুকলিনের একটি ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে আটক রয়েছেন।
মাদুরোর নিযুক্ত আইনজীবী জানান, তিনি বর্তমানে জামিনের আবেদন করছেন না, তবে ভবিষ্যতে এটি করা হতে পারে। শুনানি শেষে বিচারক মামলার পরবর্তী তারিখ আগামী ১৭ মার্চ নির্ধারণ করেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, শুনানিকালে আদালতের ভেতর এক ব্যক্তি স্প্যানিশ ভাষায় চিৎকার করে বলেন, মাদুরোকে যা করেছেন তার জন্য মূল্য দিতে হবে। এর জবাবে মাদুরো বলেন, “আমি একজন অপহৃত প্রেসিডেন্ট, একজন যুদ্ধবন্দি।” পরে আদালতের নিরাপত্তা কর্মীরা তাঁকে বের করে নেন।
পরে আদালতে হাজির করা হয় তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। সেই সময় এজলাসে উপস্থিত একজন আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে থাকলে বিচারক তাকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।