২৩ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের একটি দৃশ্য, যেখানে বাংলাদেশের দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদ জানানো হয়।
ছবি: সংগৃহীত bhaskarenglish
মেলবোর্ন, ৮ জানুয়ারি: ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত প্রায় ৯টা। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক দীপু দাসকে (২৮) ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রথমে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে বিবস্ত্র করে রাস্তার পাশের একটি গাছে গলায় রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখার পর পুড়িয়ে হত্যা করে ’তৌহিদী জনতা’। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ছয়জন হিন্দু নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এই সহিংসতার অভিঘাত এবার সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। শুধু কলকাতাতেই প্রায় ১০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে, তার ছায়া খুব শিগগিরই পশ্চিমবঙ্গেও পড়তে পারে।
৭৪ বছর বয়সী নকুল ভট্টাচার্য, যিনি ২৩ ডিসেম্বরের বিক্ষোভে অংশ নেন, বলেন,
“দীপু দাসকে যেভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তার চেয়ে ভয়াবহ আর কী হতে পারে? কাল এটা আমার ছেলের সঙ্গেও হতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে এখানেও একই অবস্থা। বাংলাদেশে যেমন হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, বাংলাতেও তার থেকে আলাদা কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গ এখন বাংলাদেশের নকল হয়ে গেছে।”
২৯ বছর বয়সী সঙ্গীতা অভিযোগ করেন,
“মমতা দিদি বাংলাদেশি আর জিহাদিদের এখানে নিয়ে আসছেন। এতে এখানকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।”
পুলিশি লাঠিচার্জ ও গ্রেপ্তার ঘিরে ক্ষোভ
কলকাতার প্রথম দফার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নিতী ভট্টাচার্য বলেন,
“আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছিলাম। তবুও পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়, একজন সহকর্মীর নাক ভেঙে দেয়। মহিলাদের চুল টেনে ধরা হয়, গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।”
তার দাবি, প্রশাসনের কাছে ইমেইলে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, তবুও তাদের আটকানো হয়। মোট ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে ৭ জন নারী।
“রাত ২টায় হঠাৎ আমাদের মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য নেওয়া হচ্ছিল, আমরা ভয়ে যাইনি,” বলেন নিতী।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুলিশ মোবাইলের পাসওয়ার্ড চেয়েছিল এবং পরিবারে ফোন করার শর্ত হিসেবে পাসওয়ার্ড দিতে চাপ দিয়েছিল।
প্রায়োনীতি, আরেক বিক্ষোভকারী, বলেন,
“আমাদের বিরুদ্ধে ‘হত্যাচেষ্টা’র মামলা দেওয়া হয়েছে। আমার পকেটে শুধু একটা কলম ছিল, সেটাকেও অবৈধ অস্ত্র দেখানো হয়েছে।”
নকুল ভট্টাচার্যও অভিযোগ করেন,
“৩–৪ দিন জেলে রেখে আমাদের নির্যাতন করা হয়েছে। সামনে আমার চোখের সামনে এক মেয়েকে এমন মারধর করা হয়েছে যে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
এক বিক্ষোভকারী মোহাম্মদ সরফরাজ জানান, লালবাজারে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং স্বীকার করেছিলেন যে বহু ধারাই ভুলভাবে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
কলকাতা পুলিশের দক্ষিণ-পূর্ব বিভাগের ডেপুটি কমিশনার ড. ভোলানাথ পান্ডে বলেন,
“বিক্ষোভের সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। সেই কারণে ৮টি ধারায় মামলা করা হয়েছে। তদন্ত চলছে, চার্জশিট পরে দেওয়া হবে।”
রাজনীতিতে তীব্র পাল্টাপাল্টি
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রদীপ মুখার্জি বলেন,
“বিজেপি নির্বাচনের আগে ভয়ের বয়ান তৈরি করছে যে আমরা রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের বসাচ্ছি। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। হিন্দুরা বিপদে আছে এসআইআরের কারণে, বাংলাদেশিদের জন্য নয়।”
তিনি দাবি করেন, এসআইআরের নামে প্রায় ৫৮ লক্ষ মতুয়া ভোটার ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
বিজেপি মুখপাত্র জ্যোতি চট্টোপাধ্যায় বলেন,
“বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ দুই জায়গাতেই বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যা কমছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গাজার জন্য কথা বলেন, কিন্তু হিন্দুদের জন্য নীরব।”
রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত বলেন,
“বাংলাদেশে এখন পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান শোনা যাচ্ছে। হিন্দুরা সেখানে টার্গেট হচ্ছে। এর প্রভাব অবশ্যই বাংলায় পড়বে।”
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মৈনাক পুততুন্ডা বলেন,
“বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পড়বে। ধর্মের ভিত্তিতে মেরুকরণ বাড়বে এবং হিন্দু ভোটারদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হতে পারে। মাত্র ৫–৭ শতাংশ ভোটের হেরফেরেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে।”
প্রাক্তন তৃণমূল নেতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ওমপ্রকাশ মিশ্র বলেন,
“সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা একটি মানবিক ইস্যু। পশ্চিমবঙ্গে সব সম্প্রদায় এখনো শান্তিপূর্ণভাবে বাস করছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এখানে দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।”
সূত্র: Bhaskar English, সৃষ্টী মিশ্রা, কলকাতা
বাংলা সারসংক্ষেপ: OTN Bangla Desk