এক দশক পর জাতিসংঘের আদালতে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ জানুয়ারি- এক দশকের অপেক্ষার পর মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালত বিশ্ব আদালত নামেও পরিচিত। সোমবার দেশটির স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে। টানা তিন সপ্তাহ ধরে এই শুনানি চলবে।
জাতিসংঘের আদালতে দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার তদন্তে গঠিত ‘ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’-এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে এই মামলার মূল শুনানি শুরু হতে যাচ্ছে।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে হামলার ঘটনা ঘটে। মিয়ানমার সরকার ওই হামলার জন্য সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মিকে দায়ী করে। এর জেরে ওই বছরের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী।
এই অভিযানের সময় বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে, সে সময় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের বড় একটি অংশ এখনও বাংলাদেশেই বসবাস করছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের পরপরই জাতিসংঘ একটি স্বাধীন অনুসন্ধানী দল গঠন করে। ওই দলের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানকে সরাসরি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রতিবেদনই পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করে।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের করে। সোমবার যে শুনানি শুরু হচ্ছে, সেটি মূলত সেই মামলারই বিচারিক কার্যক্রম।
রোহিঙ্গা নিপীড়নের সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন নোবেলজয়ী অং সান সুচি। তিনি জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং গাম্বিয়ার মামলাকেও ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছিলেন। তবে ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুচিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং দুর্নীতির অভিযোগে সেনাবাহিনী পরিচালিত আদালতে তার বিচার চলছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার প্রধান তদন্তকারী নিকোলাস কৌমজিয়ান রয়টার্সকে বলেন, এই মামলার মাধ্যমে গণহত্যার সংজ্ঞা কী, গণহত্যার অভিযোগ কীভাবে প্রমাণিত হয় এবং এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার মধ্যে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স