কারাগারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর খ্যাতিমান হিন্দু সংগীতশিল্পী ও আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু নিয়ে পরিবার ও প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি দাবি। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ জানুয়ারি: বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান হিন্দু সংগীতশিল্পী ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রলয় চাকী কারাগারে মারা গেছেন। তাঁর বয়স ছিল ৬০ বছর। প্রলয় চাকী ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পাবনা জেলার সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং নব্বইয়ের দশকের একজন জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পরিবার ও আওয়ামী লীগ পুলিশের বিরুদ্ধে অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুললেও প্রশাসন বলছে, এটি ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু।
প্রলয় চাকী গত ১৬ ডিসেম্বর পাবনার পাথরতলা এলাকার নিজ বাসা থেকে পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন–সংক্রান্ত একটি মামলায় তাঁকে আটক করা হয় এবং এরপর থেকে তিনি পাবনা জেলা কারাগারে ছিলেন। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রথমে পাবনা জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেই রবিবার রাতে (১১ জানুয়ারি) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নির্যাতনের অভিযোগ বনাম প্রশাসনের বক্তব্য
প্রলয় চাকির মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন নির্বাচনমুখী বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে। এর আগে ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর সংখ্যালঘু ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর সহিংসতা বেড়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, প্রলয় চাকী কারাগারে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর পরিবার বলছে, যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে তিনি মারা গেছেন।
তাঁর ছেলে সনি চাকী বলেন,
“আমার বাবার বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত মামলা ছিল না। তাঁকে অকারণে হয়রানি করা হয়েছে। কারাগারে তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ার বিষয়টি আমাদের জানানো হয়নি। চিকিৎসার অভাবেই তিনি মারা গেছেন।”
তবে পাবনা জেলা কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট ওমর ফারুক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“প্রলয় চাকি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হচ্ছিল। অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।”
প্রশাসনের দাবি, তিনি অসুস্থতার কারণেই মারা গেছেন এবং এতে কোনো নির্যাতনের বিষয় নেই।
কে ছিলেন প্রলয় চাকী
প্রলয় চাকী নব্বইয়ের দশকে একজন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র, পাবনা–তে সংগীত পরিচালনা করতেন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রলয় চাকী, যিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ছবি: সংগৃহীত
বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন,
“রাজনীতির বাইরে প্রলয় চাকী ছিলেন একজন আন্তরিক সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পী। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।”
পাবনা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সম্পাদক ভাস্কর চৌধুরী বলেন,
“এইভাবে তাঁর মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। এটি সত্যিই বেদনাদায়ক।”
প্রলয় চাকির মৃত্যু এখন শুধু একজন শিল্পীর প্রয়াণ নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে যেভাবে হিন্দুদের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ উঠছে, তাতে অনেকেই মনে করছেন দেশটি এক ধরনের ভয় ও দমনমূলক পরিবেশের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
প্রলয় চাকীর মৃত্যু শুধু একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রস্থান নয়, এটি একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—সংখ্যালঘু পরিচয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ কি এখন কাউকে কারাগারে নিরাপত্তাহীন করে তুলছে? তাঁর পরিবার ও দল দাবি করছে, তিনি যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক আচরণ পাননি। যদিও প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক মতের কারণে কেউ যেন নির্যাতনের শিকার না হন, সেটিই মৌলিক প্রত্যাশা।