জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলু। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন ১৪ জানুয়ারি- চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে যৌথবাহিনীর অভিযানে আটক হওয়ার পর হেফাজতেই মৃত্যুবরণ করা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকের এই পর্যবেক্ষণ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ওই অভিযানের ধরন ও দায় নিয়ে। একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়েছে, অভিযানের সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
মঙ্গলবার বিকেলে জেলা সদর হাসপাতালের ময়নাতদন্ত কমিটির সভাপতি জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. এহসানুল হক তন্ময় সংবাদমাধ্যমকে জানান, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে যে আঘাতের চিহ্নের উল্লেখ ছিল, ময়নাতদন্তে পাওয়া দাগগুলোর সঙ্গে তার মিল রয়েছে। তাঁর ভাষায়, আঘাতের চিহ্নগুলো সঙ্গতিপূর্ণ হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে জীবননগর উপজেলা শহরে চুয়াডাঙ্গা সেনা ক্যাম্পের একটি দল ঝটিকা অভিযান চালায় বলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি। এ সময় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘হাফিজা ফার্মেসি’ থেকে শামসুজ্জামান ডাবলুকে আটক করে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর তাঁকে জীবননগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছায় থানা-পুলিশ।
অভিযান নিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এটিকে ‘যৌথবাহিনীর’ অভিযান হিসেবে উল্লেখ করলেও চুয়াডাঙ্গা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই সময় কোনো পুলিশ সদস্য অভিযানে ছিলেন না। অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জামাল আল-নাসের বলেন, বিএনপি নেতাকে তুলে নেওয়ার সময় জেলা পুলিশের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। কেবল মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পুলিশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যায়।
শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক’ উল্লেখ করে আইএসপিআর জানিয়েছে, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অভিযানে অংশ নেওয়া চুয়াডাঙ্গা সেনা ক্যাম্পের সদস্যদের সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনও আলাদা করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নয়ন কুমার রাজবংশীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজন হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে।
নিহতের পরিবার এই মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে। শামসুজ্জামানের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে এবং পরিবারকে কোনোভাবে জানানো হয়নি। তাঁর মেয়ে রাইসা বাবার হত্যার বিচার চেয়ে প্রশ্ন তোলে, কী অপরাধ ছিল তাঁর বাবার। নিহতের ভাই কাজল বলেন, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং অমানবিক নির্যাতনের ফল।
ঘটনার পর জীবননগর ও চুয়াডাঙ্গা শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা হাসপাতাল ও সড়ক অবরোধ করেন, টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জেলা বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাতে এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে।
ডাবলুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের নামে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতনের ফলেই শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যু হয়েছে। তদন্তে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।