ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এনপিএর ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করা হয়। ছবি: সমকাল
মেলবোর্ন, ১৭ জানুয়ারি- বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন জোট, প্ল্যাটফর্ম বা উদ্যোগের আবির্ভাব নতুন নয়। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন সামনে এলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন উদ্যোগ আরও চোখে পড়ে। কখনও ক্ষমতা বা নির্বাচনি হিসাবকে সামনে রেখে, আবার কখনও আদর্শিক অবস্থান থেকে এসব প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। কেউ কেউ সরাসরি নির্বাচনে অংশ না নিয়েও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারা বা মূল্যবোধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন বা এনপিএ। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা এই পাঁচটি মূলনীতিকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছে সংগঠনটি।
জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় থাকা বাম ও মধ্যপন্থি তরুণদের উদ্যোগে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মে রয়েছে তিনজন মুখপাত্র এবং ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। এতে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন অরাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। এনপিএ নেতারা জানিয়েছেন, তারা আপাতত সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তবে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান থেকে রাজনৈতিক ভূমিকা রাখবেন এবং চলমান রাজনীতিতে নৈতিক ও গণতান্ত্রিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা করবেন।
শুক্রবার ১৬ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এনপিএ নেতারা বলেন, দেশের রাজনীতিতে যে সংকট ও অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই একটি বিকল্প নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে এই প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ঘোষণাপত্রে চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছে এনপিএ। সেখানে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগের কথা বললেও দেড় বছর পর ভিন্ন চিত্র সামনে আসছে। যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভাষা ও চর্চা আবার ফিরে আসছে বলে অভিযোগ তাদের।
এনপিএ নেতাদের মতে, গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত নয়। সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর ও অধিকার নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের মূল অংশ। কিন্তু বাস্তবে ধর্মীয়, জাতিগত ও লৈঙ্গিক সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই কোনও না কোনওভাবে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের ভাষায়, এই বাস্তবতার বিরুদ্ধেই জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পরিচয় ব্যবহার করে গড়ে ওঠা অনেক সংগঠন প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই শূন্যতা থেকেই বিবেকের দায়বদ্ধতা অনুভব করে এনপিএ গড়ে তোলা হয়েছে।
নতুন এই প্ল্যাটফর্ম দেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, জাতীয় রাজনীতিতে নতুন প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করে বাস্তব কর্মকাণ্ডের ওপর।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর গত দেড় বছরে তরুণরা একাধিকবার আশা ভঙ্গের শিকার হয়েছেন। অনেকে বড় প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যুক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তারা তরুণদের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক অনুভূতি বুঝতে পারেননি। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও পরে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে তরুণদের একটি অংশ হয়তো ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইছে। তবে এনপিএর আদর্শিক অবস্থান আগে পরিষ্কার হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
সাইফুল হকের মতে, এনপিএ হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে না। তবে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে পারলে ভবিষ্যতে এটি একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এনপিএর তিন মুখপাত্র হলেন ফেরদৌস আরা রুমী, মঈনুল ইসলাম তুহিন ও নাজিফা জান্নাত। ফেরদৌস আরা রুমী ও তুহিন খান লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত। নাজিফা জান্নাত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী।
১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব তুহিন খান, সাবেক উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক অলিক মৃ এবং সাবেক কালচারাল সেলের উপপ্রধান সৈয়দা নীলিমা দোলা। এছাড়া জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক সদস্য সৈয়দ ইমতিয়াজ নদভী, শিক্ষক অলিউর সান, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু ও সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহসমন্বয়ক নূমান আহমাদ চৌধুরী এবং অ্যাক্টিভিস্ট রাফসান আহমেদও রয়েছেন।
নির্বাচনি রাজনীতিতে ভূমিকা প্রসঙ্গে এনপিএর সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধরে রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। আসন্ন নির্বাচনে তারা সরাসরি অংশ নেবেন না। তবে সুস্থ ধারার রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নেবেন এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক যেকোনও অনিয়ম বা অন্যায়ের বিরোধিতা করবেন।
এনপিএর আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাসদ (মার্কসবাদী) নেত্রী ও ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী সীমা দত্ত বলেন, এটি কোনও নির্বাচনি জোট নয়। বরং ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবেই তিনি এটিকে দেখছেন। তার মতে, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক লক্ষ্য নিয়ে এমন প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় থাকলে রাজনীতিতে অনৈতিক আচরণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ নতুন এই প্ল্যাটফর্মকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে তিনি মনে করেন, এনপিএকে আগে তাদের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। তার ভাষায়, সবাইকে নিয়ে চলার কথা বলা এবং একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যমপন্থি দাবি করার মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার না হলে তারা আরেকটি রাজনৈতিক জট হিসেবেই পরিচিত হতে পারে।
আগামী নির্বাচনে এনপিএ কতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে, সে বিষয়ে বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে তাদের বাস্তব কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন