মেলবোর্ন, ৩১ জানুয়ারি- স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল আন্দালুসিয়ার পাহাড়ে সম্প্রতি দেখা গেছে এক বিস্ময়কর দৃশ্য। আইবেরিয়ান লিংক্স- যার গায়ের স্বাভাবিক রং বাদামি ও কমলার মিশ্রণ- হঠাৎ করেই প্রায় পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে। শুধু শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কালো ছোপগুলো অটুট, যা প্রতিটি লিংক্সের জন্মগত পরিচয়চিহ্ন। স্ত্রী লিংক্সটির নাম স্যাটুরেজা। তার এই রূপান্তর শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিজ্ঞানীদেরও গভীর ভাবনায় ফেলেছে।
রঙ বদল নতুন নয়, তবু বিস্ময়কর
প্রাণিজগতে রঙ বদল অজানা কোনো ঘটনা নয়। চ্যামেলিয়ন পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে নেয় নিজের রং, অক্টোপাস মুহূর্তেই বদলে ফেলে শরীরের আভা, আবার তুষারাচ্ছন্ন অঞ্চলের স্নোশু খরগোশ ঋতুভেদে সাদা হয়ে যায়। কিন্তু আইবেরিয়ান লিংক্সের মতো একটি বিরল ও বিপন্ন প্রজাতিতে, তাও জন্মের অনেক পরে গিয়ে রঙ হারানো- এ ঘটনা ব্যতিক্রমী।
জিনগত নয়, পরিবেশগত প্রভাব?
আন্দালুসিয়ার আইবেরিয়ান লিংক্স পুনঃপ্রবর্তন কর্মসূচির সমন্বয়কারী হাভিয়ের সালসেদোর মতে, স্যাটুরেজার ক্ষেত্রে অ্যালবিনিজম বা লিউসিজমের কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, অ্যালবিনিজমে কালো দাগ থাকার কথা নয়, আর লিউসিজমে রঙ হারানোর ধরন ভিন্ন হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- স্যাটুরেজা জন্মেছিল স্বাভাবিক রঙ নিয়েই; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ের রং ফিকে হতে শুরু করে।
এর আগেও আরেকটি স্ত্রী লিংক্সের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে একই ধরনের রঙ পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল, যা পরে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে গবেষকদের ধারণা জোরালো হচ্ছে যে এটি সাময়িক ডিপিগমেন্টেশন, যার পেছনে পরিবেশগত চাপ, মানসিক স্ট্রেস বা বাহ্যিক কোনো প্রভাব কাজ করতে পারে।
দূষণের প্রভাব কি শরীরের রঙে?
স্পেনের ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল (সিএসআইসি)-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও রঞ্জক বিশেষজ্ঞ ইসমাইল গালভান মনে করেন, পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তার ভাষায়, “আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না কোন বাহ্যিক উপাদান এ ধরনের পরিবর্তন ঘটায়, তবে দূষণের প্রভাব থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”
এই আশঙ্কাকে আরো জোরালো করে কোস্টা রিকার ম্যান্টলড হাওলার বানর। গত এক দশকে এসব বানরের কালো গায়ে কমলা ও হলুদ ছোপ দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ পুরোপুরি কমলা রঙের হয়ে উঠছে। গবেষকদের ধারণা, আশপাশের কৃষিজমিতে ব্যবহৃত আগ্রোকেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ এর পেছনে দায়ী হতে পারে।
মেলানিনের ওঠানামা
প্রাণীর শরীরের রঙ নিয়ন্ত্রণ করে মূলত মেলানিন। কালো, বাদামি বা লালচে রঙ- সবই এই রঞ্জকের তারতম্যের ফল। হাওলার বানরের ক্ষেত্রে কালো মেলানিন কমে যাচ্ছে, আর স্যাটুরেজার ক্ষেত্রে কমলা রঙ ফিকে হলেও কালো ছোপ রয়ে গেছে।
গবেষক লুইস মন্তোলিউ জানান, প্রাণী ও মানুষের শরীরে রঞ্জক নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৭০০টি জিন কাজ করে। অল্প কয়েকটি জিন বদলালে অ্যালবিনিজম দেখা দিলেও, অনেক জিন আছে যেগুলো বয়স বা পরিবেশগত প্রভাবে ধীরে ধীরে রঙ বদলে দিতে পারে।
‘সিলভার ঘোড়া’র উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জন্মের সময় স্বাভাবিক রঙ থাকলেও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রাণী ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যায়- যার সঙ্গে ভিটিলিগোর মতো রোগপ্রক্রিয়ার মিল থাকতে পারে।’
রহস্য এখনো অমীমাংসিত
স্যাটুরেজার রঙ পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে হলে প্রয়োজন জিনোম বিশ্লেষণ ও ত্বকের টিস্যু পরীক্ষা। যদিও বন্য পরিবেশে বসবাসের কারণে এসব পরীক্ষা করা সহজ নয়। তবু স্বস্তির বিষয়, স্যাটুরেজা সম্পূর্ণ সুস্থ আছে, শিকার করতে পারছে এবং সফলভাবে বাচ্চাও বড় করছে।
তবুও তার সাদা শরীর বিজ্ঞানীদের মনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে- প্রাণীদের রঙ বদল কি নিছক ব্যতিক্রম, নাকি পরিবর্তনশীল পরিবেশের নীরব সতর্ক সংকেত?
সূত্র: এল পাইস