বাংলাদেশ

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিত করতে এআই ব্যবহার করবে মহারাষ্ট্র সরকার

  • 11:14 pm - February 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৯ বার
এআই। প্রতীকী ছবি

মেলবোর্ন, ২ ফেব্রুয়ারি- ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। গত প্রায় দশ মাস ধরে ভারতের একাধিক রাজ্যে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চললেও, এবার প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করার কথা জানানো হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ ঘিরে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নির্ভুলতা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবীশ সম্প্রতি জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভির একটি অনুষ্ঠানে জানান, রাজ্যে বেআইনিভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিত করতে একটি এআই টুল তৈরি করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই টুলটি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) বম্বের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং বর্তমানে এটি প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ভুলভাবে কাজ করছে। চার মাসের মধ্যে এই প্রযুক্তি শতভাগ নির্ভুলতায় পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এনডিটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, এআই টুলটির মাধ্যমে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তবে এই টুলটি ঠিক কীভাবে কাজ করবে, কোন ধরনের তথ্য বা উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে সে বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি মহারাষ্ট্র সরকার বা আইআইটি বম্বে।

এ বিষয়ে জানতে বিবিসি বাংলা আইআইটি বম্বের জনসংযোগ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সেখান থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জনসংযোগ কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন জানিয়ে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বলা হলেও, প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো জবাব আসেনি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ ধরনের এআই টুল তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য আগেই যন্ত্রকে শেখাতে হয়, যাকে বলা হয় ট্রেনিং ডেটা। এতে ছবি, ভিডিও, অডিও, মানচিত্র, ভাষার নমুনা, পোশাক-আশাক, উচ্চারণভঙ্গি এবং বসবাসের এলাকার মতো নানা উপাত্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। কলকাতাভিত্তিক ‘মিডিয়াস্কিলস ল্যাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ জয়দীপ দাশগুপ্ত বলেন, সম্ভবত এআইকে শেখানো হবে একজন তথাকথিত ‘টিপিকাল’ বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা কেমন দেখতে, কীভাবে কথা বলেন কিংবা কী ধরনের পোশাক পরেন।

তার মতে, এই প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রোফাইল তৈরি করা হতে পারে। কিন্তু এখানেই বড় সমস্যা দেখা দেয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একই ধরনের পোশাক বা দাড়ি-টুপি তো ভারতের বহু বাংলাভাষী মুসলমান ও এমনকি হিন্দুরাও ব্যবহার করেন। তাহলে যন্ত্র কীভাবে একজন বাংলাদেশি মুসলমান আর একজন ভারতীয় মুসলমান বা হিন্দুর মধ্যে পার্থক্য করবে?

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ভাষার ভিত্তিতে নাগরিকত্ব শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাংলা ভাষার উপভাষা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা বা আসামের বরাক উপত্যকার ভাষার মিল রয়েছে। একইভাবে রাজশাহী অঞ্চলের ভাষা ও পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ভাষার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের ভেতরেই এক জেলা থেকে আরেক জেলার ভাষার ভিন্নতা চোখে পড়ে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট অরিজিৎ মুখার্জী বলেন, মানুষের মুখের ভাষা রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না। তার ভাষায়, “পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার আর বাংলাদেশের লালমনিরহাটের মানুষের কথ্য ভাষা আলাদা করা কি সম্ভব? এআই যেহেতু পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট প্যাটার্ন চায়, বাস্তব জীবনের এই জটিলতা সে ধরতে পারবে না।”

তিনি আরও সতর্ক করেন, এআই বিশ্লেষণে এক শতাংশ ভুলও এখানে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ বিষয়টি সরাসরি নাগরিকত্ব ও মানবাধিকারের সঙ্গে জড়িত। ভুল ট্রেনিং ডেটা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দেওয়া হলে এআইয়ের সিদ্ধান্তও পক্ষপাতদুষ্ট হবে।

নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু এ উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, সেখানে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পাওয়া গেছে, সরকার আগে সেই হিসাব প্রকাশ করুক। তার মতে, এআই টুল আনার উদ্যোগ মূলত রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করার আরেকটি উপায়।

এদিকে গত কয়েক মাসে বিবিসি বাংলার একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বহু বাংলাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ‘পুশ আউট’ করা হয়েছে। যদিও কিছু মানুষ সত্যিই অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন, তবে একাধিক ঘটনায় প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদেরও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রমাণ মিলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে মহারাষ্ট্র সরকারের এআই ব্যবহারের ঘোষণা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এই প্রযুক্তি অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করার বদলে নিরীহ নাগরিকদের হয়রানির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, হামলা স্থগিতের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর…

আংশিক খুলছে কাতারের আকাশপথ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংকারে লাখো ইসরায়েলি

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতার সীমিত পরিসরে তাদের আকাশপথ আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।…

সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি

মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…

ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে গোপন সম্পদ? প্রশ্নের মুখে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতি,…

ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে সশস্ত্র রোবট, প্রযুক্তিনির্ভর লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আকাশজুড়ে গুপ্তচর ও হামলাকারী ড্রোনের ঝাঁক নিয়মিত উড়তে…

ইরানে এযাবৎকালের ‘বৃহত্তম বোমাবর্ষণ’ হতে পারে আজ রাতেই

মেলবোর্ন,৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au