আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩ ফেব্রুয়ারি- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের সামনে একাধিক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পাঁচটি চ্যালেঞ্জ হবে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন সামাল দেওয়া, উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর উত্থান ঠেকানো এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নির্ধারণ করা। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলাও সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব হয়ে থাকবে।
ব্রাসেলসভিত্তিক এই সংস্থার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক টমাস কিন এসব বিষয় নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ লিখেছেন। সোমবার ক্রাইসিস গ্রুপের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ঘণ্টা: ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন’ শীর্ষক ওই নিবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারের করণীয় নিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে একসঙ্গে বহু সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অর্থনীতি এখনো অনেকটাই তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা একে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য বড় বাধা।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকারকে জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন সামাল দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব মোকাবিলা করা এবং মিয়ানমার সীমান্তের কাছে শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি আনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্রাইসিস গ্রুপ। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হিযবুত তাহ্রীরের মতো কট্টরপন্থি ইসলামী গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এদের বড় একটি অংশ শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। শুধু চাকরি নয়, তরুণরা রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং উন্নয়নের সুফল সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টনের প্রত্যাশাও করছে। ‘জুলাই সনদ’সহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নে গতি না এলে তরুণদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হতে পারে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছিল কেবল লোক দেখানো।
নিবন্ধে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। দেশের ইতিহাস ও বড় ভোটব্যাংকের কারণে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না বলে মত দিয়েছে ক্রাইসিস গ্রুপ। তবে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে আন্দোলন দমনের ঘটনায় দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ সহজ হবে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর শর্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হলে সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে। তবে এর জন্য দলটির নেতৃত্বকে ২০২৪ সালের সহিংসতার দায় স্বীকার করে আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে, যা শেখ হাসিনা এখনো করেননি। এই প্রক্রিয়ায় ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো মধ্যস্থতার ভূমিকা রাখতে পারে বলেও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, পাঁচ বছর মেয়াদি একটি নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় রাজনৈতিক বিরোধ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকবে। তবে একই সঙ্গে তাদের সামনে কাজের পরিমাণ ও জটিলতাও অনেক বেশি হবে। এ কারণে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর উচিত বাংলাদেশের এই রূপান্তরপর্বে নতুন সরকারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।
নিবন্ধে সংস্কার অগ্রগতির বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি স্থিতিশীল করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের অন্যতম বড় অর্জন ‘জুলাই সনদ’, যেখানে সংবিধানসহ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে সই করেছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের কথা রয়েছে। তবে পুলিশ ও নিরাপত্তা খাত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। মব সহিংসতা ও বিচারহীনতার কারণে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সব সংস্কার বাস্তবায়ন শেষ পর্যন্ত পরবর্তী সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।
নিবন্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র ও জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। গত ১৫ বছরে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারই প্রথম বড় সংখ্যক ভোটার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
ভোটে অংশ নেওয়া দলগুলোর বিষয়ে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে বিএনপি নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে। অন্যদিকে তরুণদের সমর্থন এবং এনসিপির সঙ্গে জোটের কারণে জামায়াতও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটাররা সব রাজনৈতিক দলের বিকল্প খুঁজছেন এবং প্রধান দুই জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ওপরই নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে।