বাংলাদেশ

উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব কোথায়?

প্রতিশ্রুতি থাকলেও অধরাই উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব, প্রশ্নের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা

  • 2:56 pm - February 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৮৭ বার
দেড় বছরেও প্রকাশ করা হয়নি উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য , ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি- ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সে সময় তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টা দ্রুত তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন। সেই ঘোষণার পর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদও শেষের পথে। কিন্তু এখনো কোনো উপদেষ্টার সম্পদের তথ্য প্রকাশ পায়নি।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টানা দেড় দশকের শাসনামলে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে ক্ষুব্ধ ছিল সাধারণ মানুষ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বিশেষ করে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ সেই প্রত্যাশার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একাধিক উপদেষ্টা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে করে সরকারের ঘোষিত নৈতিক অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, যারা জবাবদিহিতার নতুন সংস্কৃতির কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এমন অস্বচ্ছতা দেশের মানুষ প্রত্যাশা করেনি। তার মতে, প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান , ছবিঃ বিবিসি

একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার ভাষায়, একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার যদি নিজেরাই সম্পদের হিসাব প্রকাশে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য এটি একটি নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে। এতে করে আগামীর মন্ত্রী ও আমলারা সম্পদের তথ্য গোপন রাখার যুক্তি খুঁজে পাবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ছবিঃ বিবিসি

নীতিমালায় কী বলা আছে
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর সরকার একটি নীতিমালা জারি করে। সেখানে বলা হয়, উপদেষ্টাদের প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমার নির্ধারিত সময়ের পর ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে আয় ও সম্পদের বিবরণ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিতে হবে। স্ত্রী বা স্বামীর আলাদা আয় বা সম্পদ থাকলেও তার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।

নীতিমালায় আরও উল্লেখ ছিল, এসব তথ্য প্রধান উপদেষ্টা উপযুক্ত পদ্ধতিতে জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন। কিন্তু নীতিমালা জারির কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই তথ্য প্রকাশের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, প্রতিশ্রুতি দিয়েও সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করায় উপদেষ্টাদের ঘিরে সন্দেহ তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ ধরে নিতে পারে, সম্পদের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলেই হয়তো তথ্য প্রকাশে অনীহা দেখা যাচ্ছে।

অনিয়মের অভিযোগে আস্থার সংকট
গত ১৭ মাসে উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করেছেন, একজন মারা গেছেন। সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনী হলফনামার মাধ্যমে নিজের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাকি উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব এখনো অজানা।

এর মধ্যে উপদেষ্টাদের অধীনস্ত ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারীদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকেও সরানো হয়। যদিও এসব ঘটনায় উপদেষ্টারা নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও বিশ্লেষকদের মতে, অধীনস্তদের কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধিকারকর্মী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা মনে করেন, উপদেষ্টাদের নিজেদের স্বার্থেই সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা উচিত ছিল। তার মতে, সাময়িক দায়িত্ব শেষে তারা আবার স্বাভাবিক পেশাগত জীবনে ফিরে যাবেন। তাই স্বচ্ছতার উদাহরণ রেখে যাওয়াই হতো সবচেয়ে শক্ত অবস্থান।

এখনো কি সুযোগ আছে
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ হলেও এখনো সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে মনে করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, দায়িত্ব ছাড়ার আগেই যদি উপদেষ্টারা ক্ষমতা গ্রহণের সময় ও দায়িত্ব শেষে নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেন, তাহলে সেটি ভবিষ্যতের সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

কিন্তু সেই উদ্যোগ না নিলে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

সুত্রঃ  বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

মণিপুরে নতুন করে জাতিগত সহিংসতা, নিহত ৫

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নতুন করে জাতিগত সহিংসতায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পৃথক দুটি ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। কুকি ও নাগা…

সুইডিশ দূতাবাসে শেনজেন ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ

ঢাকার সুইডিশ দূতাবাস শেনজেন ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ করেছে। এখন থেকে শেনজেন ভিসা, আমন্ত্রণপত্র, আপিল এবং আবেদনসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বা সহায়তার জন্য সরাসরি সুইডিশ মাইগ্রেশন…

ঋণের চাপে ট্রেনের নিচে ব্যবসায়ী, চিরকুটে লিখে গেলেন ‘সুদখোর’দের নাম

গাইবান্ধায় আবু বক্কর সিদ্দিক বিপুল (৫২) নামে এক চা পাতার ব্যবসায়ীর ট্রেনে কাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। তার হাতে পাওয়া একটি চিরকুটে নিজের মৃত্যুর…

পটুয়াখালীতে কাফনের কাপড় পরে মুক্তিযোদ্ধার আমরণ অনশন

নিজের বসতভিটায় নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা, বাড়িতে হামলার বিচার এবং বরাদ্দ পাওয়া সরকারি ঘরের নির্মাণকাজ শেষ করার দাবিতে কাফনের কাপড় পরে আমরণ অনশন শুরু করেছেন বীর…

সকালেই শিল্পাঞ্চলের তিন কারখানায় আচমকা হামলা

রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে তিনটি পোশাক কারখানায় আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার শিকার কারখানাগুলো হলো ফারইস্ট, ডিভাইন ও এপেক্স। তবে কারা…

আওয়ামী লীগ ও জামায়াত: রাজনৈতিক জোটের ইতিহাসে বিচিত্র বাঁক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা জামায়াতে ইসলামী গোপন সমঝোতায়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au