ঢাকায় ফিরলেও বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন বাঁধন, ভেনিসের হামলার ট্রমা কাটেনি এখনও
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : ইতালির ভেনিসে হামলা ও হেনস্তার ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অভিজ্ঞতার মানসিক ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন।…
বাংলাদেশে গণপিটুনি, কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হত্যাকাণ্ড, ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং জমি দখলের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গণপিটুনির পাশাপাশি মাজার, সংবাদপত্রের কার্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্মৃতিচিহ্নে হামলার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি কবর থেকে মরদেহ তুলে ফেলার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্দো-এশিয়ান নিউজ সার্ভিসের (আইএএনএস) বরাতে ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চিত্র তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ৩৮ বছর বয়সী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে হত্যার ঘটনা এবং রাজধানী ঢাকায় একটি দাতব্য মাতৃসদনে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এসব ঘটনায় ব্যক্তিগত বিরোধ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং সম্পত্তি দখলের মতো বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার চিত্র উঠে এসেছে।
চলতি বছর গণপিটুনিতে নিহত ২৫৬ জন
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫৩৭টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৭৫ জন।
তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে গণপিটুনির ঘটনা ছিল ৪২৮টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ১৬৯টি। অর্থাৎ আগের বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর গণপিটুনির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এদিকে ঢাকাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে গণপিটুনির ঘটনা ছিল ১৯৮টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ১২৮টি।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য সংগ্রহ ও হিসাব করার পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে পরিসংখ্যানগুলোতে একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেশে গণপিটুনি এখন গুরুতর জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে এবং এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছে দ্য ডিপ্লোম্যাট।
ইউনূস সরকারের সময়েও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা এই সরকার অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। তবে সরকার পরিবর্তনের পরও গণপিটুনি ও বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মাতৃসদনের জমি দখলের অভিযোগে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
প্রতিবেদনে সম্পত্তি দখলের ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হিসেবে রাজধানীর একটি সরকারি মাতৃসদনে হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৫০ বছর বয়সী ওই সরকারি মাতৃসদনটি স্থানীয় বস্তি এলাকার নারীদের জন্য একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন দোকানদার হাসপাতালের জমি দখলের উদ্দেশ্যে সেখানে হামলা চালান।
ঘটনাটিতে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর দলটি কয়েকজন স্থানীয় নেতাকে বহিষ্কার করে। পাশাপাশি একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলেও দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধর্মীয় সহিংসতায় জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির সহযোগীদের ভূমিকা নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সাতক্ষীরায় ৩৮ বছর বয়সী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে হত্যার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্ম রক্ষার নামে তাকে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণপিটুনি, ধর্মীয় অভিযোগে সহিংসতা, সম্পত্তি দখল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা জননিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরও এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা বন্ধ না হওয়ায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au