চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৭ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশে উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় কমলেও বিদেশি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া, বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সরকার ক্রমেই সহজে পাওয়া বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। সব মিলিয়ে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে দেশের বিদেশি ঋণের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যা অর্থনীতিকে বাড়তি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। ২০২২ সালের জুনে এই ঋণের পরিমাণ ছিল তার প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ তিন বছরে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৯২ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দ্রুত বৃদ্ধি।
রাজস্ব আয় কম, বাজেট সহায়তার ওপর ঝোঁক বাড়ছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজস্ব আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় এবং বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় সরকার প্রকল্পভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে বাজেট সহায়তা ঋণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রকল্প ঋণের ক্ষেত্রে অনুমোদন, নকশা ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে। বিপরীতে বাজেট সহায়তা ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গেই ছাড় হয় এবং তা সরাসরি ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করা যায়।
২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট ৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ পেয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এসেছে ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের ছাড় ২৯ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের স্থবিরতার চিত্রই তুলে ধরে।
টাকার অবমূল্যায়নে বেড়েছে ঋণের বোঝা
বিদেশি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে টাকার অবমূল্যায়ন। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ টাকায়। কোভিড পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলার সংকট এই অবমূল্যায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে ডলারে নেওয়া ঋণের টাকার অঙ্ক স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের মোট ঋণ ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকায়। এর ফলে জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। এই মোট ঋণের মধ্যে ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে, আর বাকি অংশ বিদেশি ঋণ।
সুদ পরিশোধে বাড়ছে ব্যয়, সংকুচিত হচ্ছে বাজেট
ঋণের অঙ্ক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই সরকার সুদ বাবদ ব্যয় করেছে ৩১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৯ শতাংশ এবং বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৮০ শতাংশ, যা বিশেষজ্ঞদের মতে উদ্বেগজনক প্রবণতা।
বিশেষ করে ট্রেজারি সিকিউরিটিজে সুদ ব্যয় ২১ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে।
পরিচালন ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশই সুদে
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা গেছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে। একক খাত হিসেবে এটিই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়।
চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে পরিচালন বাজেট ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এই পরিচালন বাজেটের ২২ শতাংশ বা ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে শুধু সুদ পরিশোধের জন্য। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ১ লাখ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উদ্বৃত্ত থাকলেও উন্নয়ন ব্যয়ে স্থবিরতা
হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের মোট আয় ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং মোট ব্যয় হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। এতে পরিচালন ব্যয় শেষে সরকারের হাতে ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। উন্নয়ন ব্যয় সম্পন্ন করার পরও সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প কম নেওয়া এবং চলমান প্রকল্পে ব্যয় কম হওয়াতেই এই উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। রাজস্ব আয় ২০ শতাংশের বেশি বাড়লেও সেই অনুপাতে উন্নয়ন ব্যয় বাড়েনি।
বৈদেশিক ঋণ ৭৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। এই হিসাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ এবং সরকারের গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইয়েনের ওঠানামায় নতুন ঝুঁকি
ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাপানি ইয়েনে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ায় মুদ্রা ঝুঁকিও বেড়েছে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের দায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই মুদ্রা অস্থিরতা ঋণ পরিশোধে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মেগা প্রকল্পে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকলেও রিজার্ভ ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ বাজেট সহায়তা নিতে হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ বেড়েছে।
সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সুদ পরিশোধ ও বেতন-ভাতার মতো ব্যয় কমানোর সুযোগ না থাকায় বাজেট কাঠামো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ঋণ নেওয়া হলে তা এমন খাতে বিনিয়োগ করা জরুরি, যেখান থেকে অর্থনৈতিক সুফল সুদ ও আসলের চেয়েও বেশি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায় জোরদার করা, উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত ফলদায়ক উন্নয়ন প্রকল্পে সীমিত ঋণ ব্যবহারের বিকল্প নেই। অন্যথায় সুদ পরিশোধই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হয়ে উঠবে, যা উন্নয়ন ব্যয়কে আরও সংকুচিত করে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au