রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ ফেব্রুয়ারি- অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। তিনি বলেন, এই সময়কালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। চট্টগ্রামের রাউজান ও মীরসরাইয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি পরিদর্শন শেষে মানবাধিকার সংগঠন ‘সিটিজেনস অব হিউম্যান রাইটস’ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চট্টগ্রামের রাউজান ও মীরসরাই উপজেলায় সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্তত ১৯টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় রাতে বাড়িগুলোর দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে আগুন দেওয়া হয়। ফলে ভেতরে অবস্থানরত পরিবারগুলোর প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল বলে জানান আয়োজকরা।
অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস তার বক্তব্যে বলেন, “১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ হলো— বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা। তারা এখন রাষ্ট্রের কাছে কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ।”
নির্বাচনের প্রাক্কালে সংখ্যালঘুদের ওপর এমন সহিংস ঘটনাকে ‘নির্মম ও পরিকল্পিত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি, মীরসরাইয়ে ডাকাতি হয়নি, কোনো মালামাল নেওয়া হয়নি। বাইরে থেকে সিটকিনি লাগিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য একটাই— আতঙ্ক সৃষ্টি করা। আবারও পুড়িয়ে মারার চেষ্টা। ভয় তৈরি করা, যেন তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও সংবিধান অনুযায়ী অন্য ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালনের অধিকার থাকার কথা। কিন্তু এই ১৮ মাসে আমরা দেখেছি, অন্য ধর্ম শান্তিতে পালন করা যায়নি। বাস্তবতা হলো, সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”
সংবাদ সম্মেলনে ‘সিটিজেনস অব হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি রাউজান ও মীরসরাইয়ে সংঘটিত অগ্নিসংযোগের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, “এই ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অগ্নিসংযোগকারীদের উদ্দেশ্য ছিল পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে মারা। এতে এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।”
তিনি জানান, এসব ঘটনার পর স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তাহীনতায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন, পালাক্রমে ঘুমাচ্ছেন এবং নিজেদের উদ্যোগে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন।
জাকির হোসেন তার সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নির্বাচনি এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিশেষ কার্যকরী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা এবং এ বিষয়টি নিয়মিত তদারকির জন্য উচ্চ-পর্যায়ের একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সেল গঠন করা।
২. রাউজান ও মীরসরাইসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতার তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা।
৩. ক্ষতিগ্রস্থদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৪. ক্ষতিগ্রস্থদের মানসিক আঘাত দূরীকরণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৫. মানবাধিকার কমিশন যাতে এ বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারিতে রাখেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন।