বাংলাদেশ

ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে নতুন মোড়, বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ কি

  • 3:58 am - February 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৫৫ বার
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতির ঘোষণা দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প: (রয়টার্স, হোয়াইট হাউস, ২০২৫)

মেলবোর্ন, ২২ ফেব্রুয়ারি- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্ক নীতিতে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’ নামে পরিচিত নির্বাহী আদেশকে অসাংবিধানিক ও আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করেছে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।

এই রায়ের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করা ট্রাম্পের শুল্ক নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক চুক্তিতে গিয়েছে, তাদের জন্যও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি ঘোষণা করেন, বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য প্রবেশ করলে তার ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।

এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বেড়ে গেলে বড় ক্রেতারা অর্ডার সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। বাংলাদেশকে ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে একটি চুক্তিতে পৌঁছায় দুই দেশ। এতে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক হার নির্ধারিত হয় ১৯ শতাংশ।

চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়। দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ তখন এই চুক্তিকে অসম ও চাপিয়ে দেওয়া বলে মন্তব্য করেন।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায়ে জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে ওই আইনের ভিত্তিতে আরোপিত শুল্ক বৈধ নয়।

তবে রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন পথ নেয়। ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে ১৫০ দিনের জন্য বৈশ্বিকভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্ক হার ১৯ শতাংশ থেকে কমে আপাতত ১০ শতাংশে নেমে আসছে বলে জানা গেছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তারাও এখন ধারা ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হবে। তবে পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বাতিল হচ্ছে না; চুক্তির শর্তগুলো বহাল থাকবে বলেই প্রশাসনের আশা।

ধারা ১২২ অনুযায়ী, ১৫০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের বাণিজ্য আচরণ, শ্রম পরিবেশ, পরিবেশগত মান, মজুরি কাঠামোসহ নানা বিষয় পর্যালোচনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। প্রয়োজনে এই সময়ের মধ্যে শুল্ক হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ক্ষমতাও রয়েছে প্রেসিডেন্টের।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তির নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, শুল্ক কমে ১০ শতাংশে আসা আপাতত স্বস্তির খবর হলেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এখনই পুরোনো চুক্তি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়। তার ভাষায়, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সময় নেওয়াই কৌশলগতভাবে ভালো হবে। কারণ, চুক্তির শর্ত নিয়ে নতুন করে চাপ দিলে ট্রাম্প প্রশাসন আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

তিনি বলেন, ১৫০ দিনের সময়সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা যাচাই করবে। বাংলাদেশের উচিত শ্রম পরিবেশ, কমপ্লায়েন্স ও পরিবেশগত মানদণ্ডে ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত ঠিক করা।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি এবং আমদানি কম। এই বাণিজ্য ঘাটতিকে সামনে রেখে পাল্টা শুল্কের যুক্তি দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।

বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সাম্প্রতিক চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রাপ্তির চেয়ে শর্ত বেশি ছিল। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি অনিশ্চিত; আজ যা কার্যকর, কাল তা বদলে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য চীন এবং তার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিগুলো। ফলে বাংলাদেশ সরাসরি টার্গেট না হলেও, বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিরতার ঢেউ থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে না।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের স্বস্তি এনে দিলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। চুক্তির শর্ত বহাল থাকছে কি না, ভবিষ্যতে শুল্ক আবার বাড়বে কি না, কিংবা তদন্তের ভিত্তিতে নতুন চাপ আসবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে সময় লাগবে।

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি জোরদার করা এবং কৌশলগতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ খোলা রাখা।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

এই শাখার আরও খবর

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানালেন ৩ উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au