কোন পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র
মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উভয়…
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- সংসারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে স্বচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন কুড়িগ্রামের এক নারী। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে সৌদি আরবে যাওয়ার পর সেখানে গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তিনি। পরে প্রাণ বাঁচাতে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং দুই মাস পর দেশে ফিরে আসেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন রংপুর ও যশোরের আরও কয়েকজন নারী। কেউ স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব নিতে বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কেউ আবার গৃহকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যদের যৌন সহিংসতার অভিযোগ তুলে দেশে ফিরেছেন।
এ ধরনের ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন নয়। বরং বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হয়রানি ও শোষণের শিকার হচ্ছেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। একই সময়ে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন। তবে বিদেশ থেকে কত নারী ফিরে এসেছেন, তার নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি নারী মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ—সব নারীর জন্য হোক’।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি নারীরা বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শুরু করেন। তবে এটি ধারাবাহিক রূপ পেতে শুরু করে ২০০৪ সালের দিকে। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশে যান। ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। করোনা মহামারির দুই বছর বাদ দিলে ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন।
তবে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নারীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন কারণে দেশে ফিরে আসছেন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু করোনাকালে ২০২০ সালেই ৪৯ হাজার ২২ জন নারী দেশে ফিরেছেন। বিমানবন্দরের তথ্য বলছে, বন্দি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে এক হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ছয় হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে দুই হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে তিন হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ৮৯১ জন নারী দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, বিদেশে তারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় কাজ করানোর মতো নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন। ব্র্যাক জানিয়েছে, দেশে ফিরে আসা নারীদের মধ্যে অন্তত ১২১ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন, যাদের পুনর্বাসনে তারা সহায়তা দিয়েছে।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করানো, কম খাবার দেওয়া এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রায় পাঁচ বছর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ধরে নিয়েছিল তিনি মারা গেছেন। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ও পুলিশের সহায়তায় তার পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
বিদেশে কর্মরত নারীদের একটি অংশ অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসের সেফ হাউসে আশ্রয় নেন। সৌদি আরব থেকে পাঠানো বিভিন্ন কূটনৈতিক চিঠিতেও এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সৌদি আরবে দায়িত্ব পালনকারী এক সাবেক রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতনের কারণে অন্তত ৫৫ জন গৃহকর্মী গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন এবং প্রতিদিনই তিন থেকে চারজন করে নারী সেখানে আশ্রয় চাইছেন।
২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট সৌদি আরব ফেরত ১১০ জন নারী গৃহকর্মীর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ফিরে আসা নারীদের ৩৫ শতাংশ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৪৪ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাদের নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। তদন্তে দেশে ফিরে আসার অন্তত ১১টি কারণ চিহ্নিত করা হয়।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে তিনটি বড় ধরনের সমস্যা দেখা যায়। প্রথমত, কাজের পরিবেশ ও বেতনসংক্রান্ত সমস্যা। অনেক নারী অভিযোগ করেন, তারা ঠিকমতো বেতন পান না এবং একাধিক বাসায় কাজ করতে বাধ্য হন। দ্বিতীয়ত, কাজের চাপ সামলাতে না পারলে নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তৃতীয়ত, যৌন সহিংসতার ঘটনা, যা অনেক সময় অত্যন্ত ভয়াবহ ও লজ্জাজনক।
তার মতে, বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পাওয়া যায় না। তাই বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নীতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au