4. Top Head

স্নাতক ভিসার ফি বাড়িয়ে দ্বিগুণ করল অস্ট্রেলিয়া

 প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ছাড়

  • 10:22 pm - March 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০৭ বার
অস্ট্রেলিয়ায় গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ স্কলারশিপে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডির সুযোগ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১২ মার্চ- সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে স্নাতকদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার অস্থায়ী স্নাতক ভিসার আবেদন ফি দ্বিগুণ করেছে দেশটির সরকার। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জন্য এ বাড়তি ফি প্রযোজ্য হবে না। সরকারের এই সিদ্ধান্তে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হঠাৎ করেই বাড়তি কয়েক হাজার ডলার জোগাড় করার চাপে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের এই পরিবর্তনটি সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে। এক শরতের রবিবার, যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের খবর নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছিল, তখন নীরবে অস্থায়ী স্নাতক ভিসার নিয়মে পরিবর্তন আনে অস্ট্রেলিয়া। এর ফলে রাতারাতি এই ভিসার আবেদন ফি দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই ভিসা সাধারণত বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়, যার মাধ্যমে তারা পড়াশোনা শেষ করার পর অস্ট্রেলিয়ায় থেকে কাজ করার সুযোগ পান।

তবে শুধু ফি বাড়ানোই নয়, নতুন নিয়মে ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আবেদনকারীর পাসপোর্টের দেশের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে। সরকার বলছে, এই ধাপে ধাপে ফি নির্ধারণের নীতি কিছু নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।

তবে অভিবাসন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট অনেক সংগঠন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের নীতি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক ফি নির্ধারণের পথ তৈরি করতে পারে।

বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগঠন ‘ডেমোক্রেসি ইন কালার’-এর চেয়ারম্যান জামাল হাকিম বলেন, সরকার যদি অভিবাসন নীতিতে পাসপোর্টের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তাহলে তা ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে। তার মতে, ধাপে ধাপে নির্ধারিত ভিসা ফি ব্যবস্থা কিছু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসা কঠিন করে তুলতে পারে এবং এতে অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ভিসা ব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করে, যাকে তারা সার্বজনীন ও বৈষম্যহীন বলে দাবি করে। এই ব্যবস্থায় মূলত আবেদনকারীর অবদান, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, জাতিগত পরিচয়, ধর্ম বা লিঙ্গকে নয়। তবে বাস্তবে অভিবাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু বৈষম্যমূলক উপাদান রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ওয়ার্কিং হলিডে ভিসা নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জন্যই উন্মুক্ত এবং সেখানে বয়সসীমাও নির্ধারিত। আবার ইংরেজি ভাষাজ্ঞান পরীক্ষা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা আমন্ত্রণভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত তৈরি করে।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ মেরি ক্রক বলেন, অস্ট্রেলিয়া সরকার ক্রমশ বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসন আইনের বিভিন্ন দিক পরিবর্তন করছে। তার মতে, পাসপোর্টের ভিত্তিতে ভিন্ন আচরণ করা অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন কিছু নয়।

তিনি বলেন, সরাসরি বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য করা হয় না, তবে বয়স, স্বাস্থ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মতো নানা বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়। অনেক সময় নির্দিষ্ট অঞ্চলের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা পরোক্ষভাবে বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

নতুন নীতির অধীনে পূর্ব তিমুর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে বাড়তি ফি প্রযোজ্য হবে না। এই তালিকায় রয়েছে ফিজি, পাপুয়া নিউগিনি, সামোয়া, ভানুয়াতু এবং টোঙ্গা। এসব দেশের নাগরিকদের জন্য আগের ফি ২ হাজার ৩০০ অস্ট্রেলীয় ডলারই বহাল থাকবে। অন্য সব দেশের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই ফি দ্বিগুণ করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ সম্পর্কের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা বিনিময়ের ক্ষেত্র আরও জোরদার করার লক্ষ্যও রয়েছে।

এর আগেও ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ভিসা ও শিক্ষার্থী অভিভাবক ভিসার ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দেশের জন্য একই ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধাপে ধাপে নির্ধারিত ফি ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক সময় বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কখনো কখনো ভিসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভিসার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার মতো অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দাবি করেছেন, অস্থায়ী স্নাতক ভিসার ফি বৃদ্ধি অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়ার ইচ্ছা থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে এই ধাপে ধাপে ফি নির্ধারণের নীতি ভবিষ্যতে অন্য ভিসার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।

অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি অভিবাসনের সংখ্যা কমানোর বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। মহামারির পর অভিবাসনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর সরকার তা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল আরও কঠোর নীতি গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। ২৪ বছর বয়সী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ফাবিও ব্যাপটিস্তা বলেন, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করা ন্যায্য নয়। তার মতে, যেসব দেশের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি নেই, সেসব দেশের শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচের চাপ বহন করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, হঠাৎ করে বাড়তি ফি দেওয়ার জন্য তাকে ঋণ নিতে হয়েছে। তার পরিচিত আরও অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা বাড়তি খরচ বহন করতে না পেরে ভিসার আবেদনই করতে পারেননি।

বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে পড়াশোনা শেষ করা অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ আগামী ১৫ মার্চ শেষ হওয়ার কথা। তাদের অনেককে মাত্র দুই সপ্তাহের নোটিশে অতিরিক্ত দুই হাজার ৩০০ ডলার জোগাড় করতে হচ্ছে, যা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার মাইগ্রেশন ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী পিটার ভ্যান ভিলেট বলেন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ভিসা ফি বাড়াতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে নিয়ম পরিবর্তন করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

তার মতে, যারা আংশিক সময় কাজ করে পড়াশোনার খরচ চালান এবং নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন, তাদের জন্য অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক হাজার ডলার জোগাড় করা কঠিন। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে এমন পরিবর্তন আনা অনেকের কাছে অন্যায্য মনে হতে পারে।

তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত স্বার্থের অংশ হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে যদি অন্য অঞ্চলের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ধাপে ধাপে ফি নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু করা হয়, তাহলে তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

তার মতে, সাধারণভাবে ভিসা ব্যবস্থা দেশের উৎসভিত্তিক বৈষম্যহীন হওয়া উচিত। তবুও জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার পেছনে সরকারের কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে।

সূত্রঃ এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

আসন্ন বড় খাদ্য সংকটের জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সরবরাহে চাপ,…

‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই’

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের…

ছেলেকে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় বাবাকেও গুলি করে হত্যা

খুলনার রূপসা উপজেলায় ছেলে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় তার বাবা আক্তার ঢালীকেও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে মাগরিবের…

ইতিহাসের মহানায়ক: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

কেউ কেউ ইতিহাসে স্থান করে নেন; আবার কেউ এমনভাবে একটি জাতির জীবনে আবির্ভূত হন, যাঁকে বাদ দিয়ে সেই জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিই লেখা যায়…

অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভাঙল ফারুকী-তিশার সংসার?

শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সংসারে ভাঙনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় তিশার নামে থাকা একটি বাড়ি বিক্রি…

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তারেকের ভারত সফর কি একই সূত্রে গাঁথা?

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবি এবং বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক নতুন করে জটিল হয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au