খেলা

সালমান আগার রানআউট ঘিরে বিতর্ক, ক্রিকেটের নিয়ম কী বলে

  • 6:04 pm - March 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২২ বার
সালমান আগার রানআউট ঘিরে বিতর্ক। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে জয়–পরাজয়ের হিসাবের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি রানআউট। পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগাকে বাংলাদেশের অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ যে ভাবে রানআউট করেন, সেটিকে ঘিরে মাঠে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেও শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। কেউ এটিকে ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী বৈধ আউট বলছেন, আবার কেউ বলছেন এতে খেলোয়াড়সুলভ আচরণ বা ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’-এর ঘাটতি ছিল।

এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা, সাবেক ক্রিকেটারদের মন্তব্য এবং ক্রিকেটের নিয়ম নিয়ে বিশ্লেষণ মিলিয়ে বিষয়টি বড় বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

ঘটনার শুরু: ৩৯তম ওভারে নাটকীয় মুহূর্ত

ঘটনাটি ঘটে পাকিস্তানের ইনিংসের ৩৯তম ওভারে। সে সময় ক্রিজে ছিলেন পাকিস্তানের দুই নির্ভরযোগ্য ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলি আগা। তাদের জুটি তখন পাকিস্তানকে বড় সংগ্রহের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিল।

ঘটনাটি ঘটে পাকিস্তানের ইনিংসের ৩৯তম ওভারে। ছবিঃ সংগৃহীত

মেহেদী হাসান মিরাজ তার দশম ওভারের প্রথম তিন বলে দেন মাত্র এক রান। চতুর্থ বলটি করেন অফ স্টাম্পের বাইরে। রিজওয়ান সোজা ড্রাইভ খেলেন বোলারের দিকে। বলটি দ্রুত মিরাজের দিকে এলেও তিনি সেটি পুরোপুরি থামাতে পারেননি। বলটি তার পায়ের নিচে থেমে যায়।

নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে থাকা সালমান আগা শুরুতে রান নেওয়ার জন্য ক্রিজ ছেড়ে এগিয়ে আসেন। পরে রান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি দ্রুত পপিং ক্রিজে ফিরে যাননি। বরং বলটি মিরাজকে হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে যান এবং বলটি ধরার চেষ্টা করেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে মিরাজ দ্রুত বলটি তুলে নেন এবং আন্ডারআর্ম থ্রো করে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তের স্টাম্প ভেঙে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ দল রানআউটের আবেদন জানায়।

ঘটনার পরপরই মাঠে উত্তেজনা তৈরি হয়। সালমান আগা ক্ষোভ প্রকাশ করে মিরাজের দিকে কিছু বলেন। বিষয়টি সরাসরি তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে পাঠানো হয়।

টেলিভিশন রিপ্লে পর্যবেক্ষণ করে তৃতীয় আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা দ্রুত সিদ্ধান্ত দেন যে সালমান তখন ক্রিজের বাইরে ছিলেন এবং বল তখনো ডেড হয়নি। ফলে ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী তাকে রানআউট ঘোষণা করা হয়।

আউটের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর সালমান হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে মাঠ ছাড়েন। ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে তাকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের দিকে কিছু বলতে দেখা যায়। বাউন্ডারি লাইনের কাছে গিয়ে তিনি নিজের গ্লাভস ও হেলমেট ছুড়ে মারেন। পরে সতীর্থ মোহাম্মদ রিজওয়ান এগিয়ে এসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।

রানআউট হওয়ার আগে মোহাম্মদ রিজওয়ানের সঙ্গে ১০৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েছিলেন সালমান আগা। পাকিস্তানের ইনিংসে এই জুটিই ছিল সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

সালমান ৬২ বলে ৬৪ রান করে আউট হন। তাদের এই জুটির ওপর ভর করেই পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত ২৭৪ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায়, যা পরবর্তীতে ম্যাচে বড় ভূমিকা রাখে।

পাকিস্তান ক্রিকেট দল৷ ছবি: সংগৃহীত

ক্রিকেটের নিয়ম কী বলে

ক্রিকেটের আইন অনুযায়ী এই আউট নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের প্রণীত ক্রিকেট আইনের ৩৮ নম্বর ধারায় রানআউট সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এই আইনে বলা হয়েছে, বল যখন খেলায় সক্রিয় থাকে এবং ব্যাটার নিজের ক্রিজের বাইরে অবস্থান করেন, তখন ফিল্ডিং দল স্টাম্প ভেঙে দিলে তাকে রানআউট করা বৈধ।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বল ‘ডেড’ হয়েছে কি না। আম্পায়ার বল ডেড ঘোষণা না করা পর্যন্ত বলকে সক্রিয় ধরা হয়। সেই সময় ব্যাটার যদি ক্রিজের বাইরে থাকেন, তাহলে যে কোনো ফিল্ডার বা বোলার স্টাম্প ভেঙে তাকে আউট করতে পারেন।

সালমান আগার ক্ষেত্রে বলটি তার শরীরে লেগে থেমে গেলেও আম্পায়ার সেটিকে ডেড ঘোষণা করেননি। ফলে বল তখনো খেলায় ছিল এবং তিনি ক্রিজের বাইরে ছিলেন। এই কারণে রানআউটের সিদ্ধান্তকে ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ ধরা হয়।

মিরাজের ব্যাখ্যা

ম্যাচ শেষে মেহেদী হাসান মিরাজ এই রানআউট নিয়ে নিজের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, সালমান ক্রিজ থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। তিনি শুধু বলটি খুঁজছিলেন এবং সুযোগ দেখে স্টাম্প ভেঙে দেন।

মিরাজের মতে, যদি তিনি বল মিস করতেন তাহলে পাকিস্তানের ব্যাটাররা হয়তো রান নেওয়ার চেষ্টা করতেন। সেই ভাবনা থেকেই তিনি দ্রুত স্টাম্প ভেঙে দেন।

সালমানের প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগা পরে স্বীকার করেন যে আউটটি ক্রিকেটের নিয়মের মধ্যেই হয়েছে। তবে তিনি বলেন, তিনি হলে হয়তো ভিন্নভাবে আচরণ করতেন।

তার ভাষায়, ক্রিকেটে খেলোয়াড়সুলভ আচরণ বা স্পোর্টসম্যান স্পিরিট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি মনে করেন, সে মুহূর্তে তিনি বলটি ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কারণ তিনি রান নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন না।

বাংলাদেশ দলের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ দলের উইকেটকিপার ব্যাটার লিটন দাস এই রানআউটকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে উল্লেখ করেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, এটি কোনো চ্যারিটি ম্যাচ নয়, এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। নিয়ম অনুযায়ী আউট হলে সেটিকে অখেলোয়াড়সুলভ বলা ঠিক নয়।

বাংলাদেশ দলের স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদও একই মত দেন। তিনি বলেন, বল তখনো ডেড হয়নি এবং ব্যাটার ক্রিজের বাইরে ছিলেন। বোলার হিসেবে এমন সুযোগ পেলে রানআউটের চেষ্টা করা স্বাভাবিক।

এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনা হয়েছে ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ বা খেলোয়াড়সুলভ আচরণ নিয়ে। অনেকের মতে সালমান হয়তো প্রতিপক্ষকে সাহায্য করার জন্য বলটি তুলে দিতে চেয়েছিলেন। অন্যদের মতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের জন্য ঝুঁকি নেওয়া ব্যাটারের নিজের ভুল।

পাকিস্তানের কিছু সাবেক ক্রিকেটার সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনাকে সমালোচনা করেছেন। ভারতের সাবেক ক্রিকেটার অজয় জাদেজাও মন্তব্য করেছেন যে বাংলাদেশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেলে দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।

পুরোনো বিতর্ক

ক্রিকেটে এমন বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুত না থাকার কারণে ‘টাইমড আউট’ করার আবেদন জানিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। আম্পায়ার নিয়ম অনুযায়ী তাকে আউট দেন এবং তখনও ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়।

আরও পেছনে গেলে ২০০৩ সালের মুলতান টেস্টে পাকিস্তানের উইকেটকিপার রশিদ লতিফ অলক কাপালির বিরুদ্ধে বিতর্কিত কট বিহাইন্ডের আবেদন করেছিলেন। পরে সেই ঘটনার জন্য তাকে শাস্তিও পেতে হয়েছিল।

একই ম্যাচে বাংলাদেশি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক পাকিস্তানের ব্যাটার উমর গুলকে ক্রিজের বাইরে দেখে আউট না করে সতর্ক করেছিলেন, যা অনেকেই খেলোয়াড়সুলভ আচরণের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সালমান আগার রানআউট নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গা এখানেই। ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী আউটটি সম্পূর্ণ বৈধ।বিশ্লেষকদের মতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিটি দলই প্রতিপক্ষকে আউট করার সুযোগ খোঁজে। বল ডেড না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলতেই থাকে। সেই বাস্তবতায় মিরাজ নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন।

সব মিলিয়ে দ্বিতীয় ওয়ানডের ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি রানআউট। ক্রিকেটের আইন বলছে এটি বৈধ সিদ্ধান্ত, কিন্তু খেলোয়াড়সুলভ আচরণ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে এই ঘটনা।

 

এই শাখার আরও খবর

২৫০০ একরের মেডিটেশন সেন্টার, বিতর্কিত কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বৈজ্ঞানিক লাইফস্টাইল ডেভেলপমেন্ট ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ ঘিরে বেসরকারি সংস্থা কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্র করে নানা…

ইরানে আড়াই হাজার মেরিন সেনা পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন, সঙ্গে রয়েছে ‘উভচর’ যুদ্ধজাহাজ

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন মেরিন সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে…

মধ্যপ্রাচ্যে ‘যুদ্ধঝুঁকি’ ব্যয় বাড়ায় অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ঝুঁকিতে

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘যুদ্ধঝুঁকি’ সংক্রান্ত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ব্যবস্থায়, যা দেশটির…

বর-কনেসহ ১৪ জনের মৃত্যু: ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- বাগেরহাটের রামপালে নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর–কনেসহ ১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে…

ইরান যুদ্ধে ‘জয়ের ঘোষণা দিয়ে সরে আসা উচিত’-মন্তব্য হোয়াইট হাউসের এআই উপদেষ্টার

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। হোয়াইট হাউসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ডেভিড স্যাক্স…

উত্তেজনা নিরসনে সংলাপের পথ বেছে নিতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে চীনের আহ্বান

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে চীন। দেশটি বলেছে, বলপ্রয়োগের পথ এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান করা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au