খুলনায় দুর্বৃত্তের গুলিতে সাবেক ছাত্রদল নেতা নিহত
মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- খুলনা মহানগরীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে রাশিকুল আনাম রাশু (৩৬) নামে এক সাবেক ছাত্রদল নেতা নিহত হয়েছেন। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দৌলতপুর…
মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তিতে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি রোববার জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, লটারির পরিবর্তে আবার ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ বাড়বে এবং কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা নতুন করে বেড়ে যেতে পারে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় সংসদে কুমিল্লা–৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বিগত সরকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি চালু করেছিল। তবে তাঁর কাছে বিষয়টি খুব যুক্তিসংগত মনে হয়নি। আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পদ্ধতি কী হবে, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সবার মতামত নিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তবে শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর আলোচনা শিক্ষা ব্যবস্থায় অতীতের পুরোনো সমস্যাগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে শিশুদের ওপর চাপ বৃদ্ধি, কোচিং–নির্ভরতা এবং ভর্তিকে ঘিরে অনিয়মের মতো সমস্যাগুলো আবার দেখা দিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, প্রাথমিক স্তরে কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত নয়। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি নিলে তা সরাসরি কোচিং বাণিজ্যকে উৎসাহিত করবে। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষা মানেই শিশুর মেধা যাচাইয়ের চেষ্টা, যেখানে কেউ ফেল করলে তাকে অল্প বয়সেই ‘সে পারে না’ এমন একটি নেতিবাচক পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। এতে শিশুর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি হতে পারে, যা শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মান প্রায় সমান বা কাছাকাছি হওয়া উচিত। সরকার কোনো একটি বিদ্যালয়কে ভালো আর অন্যটিকে খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না। সব বিদ্যালয়ের মান কাছাকাছি হলে ভর্তি নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতাও তৈরি হবে না। তখন যে এলাকার শিক্ষার্থী, সে সেই এলাকার বিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। এতে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যানজট কমবে এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও সহমর্মিতাও বাড়বে। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষা বা লটারির পরিবর্তে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো, ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ এবং বিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়নই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা চালু করার কথাও বলেন তিনি।
একসময় বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার কারণে অল্প বয়সেই শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য অনেক পরিবার সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠাত। ভর্তিকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল বিস্তর। ফলে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নামকরা বা তুলনামূলক ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে সমালোচনা ও আলোচনা চলতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রথমে কেবল প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু করা হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে তখনও পরীক্ষা নেওয়া হতো।
পরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম চালু করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, শিশু বয়সে মেধার পার্থক্য তেমন স্পষ্ট থাকে না। তাই এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও খুব একটা যৌক্তিক নয়। এতে শিশুদের মধ্যে অযাচিত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং কোচিং–নির্ভরতা বাড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক পদ্ধতি। কারণ এই ধরনের পরীক্ষায় সাধারণত সেই শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে থাকে, যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায়। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষার দাবির পেছনে মূলত উচ্চবিত্ত বা উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্তের একটি অংশের আগ্রহ কাজ করে, যাদের সন্তানদের জন্য অতিরিক্ত কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো বলে তিনি মনে করেন। তবে এই পদ্ধতি যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয় গড়ে তোলা গেলে অল্প বয়সে ভর্তি নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার প্রয়োজনই থাকবে না। তখন শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকার বিদ্যালয়েই পড়াশোনার সুযোগ পাবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও কমবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au