মার্কিন রণতরি ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’-এ ৩০ ঘণ্টা ধরে আগুন, অসুস্থ একাধিক নৌসেনা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ মার্চ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড–এ গত সপ্তাহে লাগা অগ্নিকাণ্ড টানা ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বলেছে। এ ঘটনায় রণতরিতে থাকা একাধিক নৌসেনা ধোঁয়ার প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
রণতরিটির নাবিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটির লন্ড্রি বা কাপড় ধোয়ার অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়। যদিও শুরুতে মার্কিন নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং এটি কোনো শত্রুপক্ষের হামলার ঘটনা নয়। তখন বলা হয়েছিল, ঘটনায় দুই নাবিক সামান্য আহত হয়েছেন। তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী, আগুনের স্থায়িত্ব ও প্রভাব আগের ধারণার চেয়ে বেশি গুরুতর ছিল।
প্রায় ১ লাখ টন ওজনের এই রণতরিটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে লোহিত সাগর এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে জাহাজটি। মার্কিন নৌবাহিনীর দাবি, অগ্নিকাণ্ড সত্ত্বেও রণতরিটির সামরিক কার্যক্রমে কোনো বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি। তবে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই রণতরিতে অবস্থানরত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ নৌসেনা ও বিমানসেনার জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুনের কারণে অন্তত ৬০০ নাবিক তাদের নির্ধারিত থাকার স্থান হারিয়েছেন। তারা এখন জাহাজের টেবিল কিংবা মেঝেতে ঘুমাতে বাধ্য হচ্ছেন। লন্ড্রি বিভাগ পুড়ে যাওয়ায় অনেকেই নিয়মিত কাপড় ধোয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, যা দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের মধ্যে বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি করেছে।
এদিকে রণতরিটিতে দীর্ঘদিন ধরে টয়লেট ব্যবস্থার সমস্যাও রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই জাহাজের স্যানিটেশন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে বারবার বাইরের সহায়তা নিতে হয়েছে।
গত জুন মাসে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের নরফোক বন্দর ত্যাগ করার পর রণতরিটি আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চল অতিক্রম করে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। এই মোতায়েন যদি এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে তা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর কোনো মার্কিন রণতরির দীর্ঘতম মোতায়েন হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত–এর ফুজাইরাহ উপকূল থেকে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি তেলের ট্যাংকারে ‘অজ্ঞাত বস্তু’ আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। এতে জাহাজটির সামান্য কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তবে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
কাতার–এর একটি শিল্প এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর তার খণ্ডাংশ নিচে পড়ে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরে সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে বাগদাদ–এ মার্কিন বাহিনী ও ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি ইরানপন্থী গোষ্ঠীর ব্যবহৃত ভবনে বিমান হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া বাগদাদের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত গ্রিন জোনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার সময় দূতাবাস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আগুন ও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের যাচাইকৃত ভিডিওতে মার্কিন দূতাবাসের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি ড্রোন মাঝপথেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে অন্তত একটি ড্রোন দূতাবাস প্রাঙ্গণের ভেতরে আছড়ে পড়ে বলে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই ধারাবাহিক উত্তেজনা ও সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
সূত্রঃ সিএনএন, আল-জাজিরা