অস্ট্রেলিয়ার ডানপন্থী দল ওয়ান নেশনের নেতা পলিন হ্যানসন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ মার্চ-অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া জুড়ে চলতি সপ্তাহে অস্বাভাবিক এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি ঘিরেই আলোচনায় উঠে এসেছেন পলিন হ্যানসন এবং তার দল ওয়ান নেশন, যাদের উত্থান এখন মূলধারার রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষ করে কোয়ালিশন জোটের প্রতি হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সুযোগেই রাজনৈতিক প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে এসে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন হ্যানসন। বহু বছর ধরে তাকে ও তার দলকে মূলধারার বাইরে রাখা হলেও বর্তমানে তারা দৃঢ়ভাবে মূল রাজনৈতিক ধারায় জায়গা করে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ফেডারেল পর্যায়েও ওয়ান নেশন কোয়ালিশনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের এক জরিপে কোয়ালিশনের প্রাথমিক সমর্থন ১৯ শতাংশে নেমে এলেও ওয়ান নেশন পেয়েছে ২২ শতাংশ সমর্থন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমন উত্থান বিশ্লেষকদের বিস্মিত করেছে।
এই রাজ্য নির্বাচনই ওয়ান নেশনের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে দলটি ভবিষ্যতে কতটা শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। যদিও নির্বাচনটি একটি রাজ্যভিত্তিক, তবুও এর প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বর্তমান লেবার সরকারের প্রধান পিটার মালিনাউস্কাস পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রিমিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন বেটিং সংস্থাও লেবার পার্টির জয় প্রায় নিশ্চিত ধরে নিচ্ছে।
তবে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়ান নেশনের পারফরম্যান্স। জরিপে এগিয়ে থাকলেও দলটিকে এখনও ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর এই অবস্থানেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন হ্যানসন। গত তিন দশক ধরে তিনি বারবার সমালোচিত হয়েছেন, অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন, এমনকি কারাবরণও করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা দীর্ঘদিন ধরে ওয়ান নেশনকে একটি প্রান্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক দল হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাদের ধারণা ছিল, এই দলের সমর্থকরা খুব সীমিত একটি জনগোষ্ঠী, যাদের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা অন্য দলগুলোর নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শুধু পুরোনো সমর্থকরাই নয়, বরং প্রধান দলগুলোর ওপর বিরক্ত সাধারণ ভোটাররাও এখন ওয়ান নেশনের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভোটারদের উপেক্ষা ও অবমূল্যায়নের ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ যখন নিজেকে অবহেলিত মনে করে, তখন তারা বিকল্প খোঁজে, আর বর্তমানে সেই বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে ওয়ান নেশন।
এদিকে, বিভিন্ন জনসভা ও প্রচারণায় হ্যানসনের প্রতি জনসাধারণের আগ্রহও লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। নানা বয়স ও বিভিন্ন জাতিগত পটভূমির মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে, করমর্দন করতে এবং ছবি তুলতে ভিড় করছেন। যা তার জনপ্রিয়তার নতুন মাত্রা নির্দেশ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বহু বছর ধরে যাকে উপেক্ষা করা হয়েছে, সেই শক্তিই এখন মূলধারার রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই নির্বাচন তাই শুধু একটি আঞ্চলিক ভোট নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।