মেলবোর্ন, ২৩ মার্চ- বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ খাদ্য মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ‘লাল’ ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে দেশ এই অবস্থান থেকে বের হতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও গত পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি পুনরায় বেড়েছে।
প্রতিবেদনটি নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্য নিরাপত্তার হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংক প্রতি ১০ থেকে ১২ মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পর্যবেক্ষণ করে খাদ্য নিরাপত্তা–বিষয়ক প্রতিবেদনে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করে। সর্বশেষ দশ মাস ধরে বাংলাদেশ ‘লাল’ শ্রেণিতে রয়েছে। এর মানে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি কমছে না, এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে এটি আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ লাল শ্রেণিতে আছে। অন্য দেশগুলো হলো ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন, জাম্বিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, মলদোভা ও রাশিয়া।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের আমদানির ওপর প্রভাব পড়বে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ৮–৯ শতাংশ হলেও বাস্তবে তা আরও বেশি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতির শ্রেণিবিন্যাস
বিশ্বব্যাংক দেশগুলোকে চার শ্রেণিতে ভাগ করেছে—
৩০ শতাংশ বা তার বেশি মূল্যস্ফীতি: বেগুনি (সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ)
৫ থেকে ৩০ শতাংশ: লাল (মোটামুটি ঝুঁকিপূর্ণ)
২ থেকে ৫ শতাংশ: হলুদ (মধ্যম ঝুঁকি)
২ শতাংশের কম: সবুজ (নিম্ন ঝুঁকি)
সম্প্রতি বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশ হয়েছে, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তা ১০.৭২ শতাংশ ছিল। খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারি মাসে ৯.০১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেশের গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশ মানে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০০ টাকায় খাবার কিনতে গেলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই খাবারের দাম হবে ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিটি ১০০ টাকায় খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ৩০ পয়সা।
গরিব মানুষের ক্ষেত্রে আয়ের বড় অংশ খাবারে চলে যায়। অনেকের আয়ের দুই-তৃতীয়াংশই খাবারের জন্য ব্যয় হয়। মূল্যস্ফীতি একধরনের অবৈধ করের মতো কাজ করছে। আয়ের স্থিতিশীলতা না থাকলে মানুষকে ঋণ নিতে বা খাবারের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে।
অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি
বিশ্বব্যাংকের বেগুনি শ্রেণির দেশগুলোতে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে। মালাউয়ি টানা ৯ মাস বেগুনি, ইরান ও জাম্বিয়া ৮ মাস, তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা ৭ মাস বেগুনি শ্রেণিতে ছিল। বাকি দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে লাল, বেগুনি, হলুদ বা সবুজ শ্রেণিতে ছিল। কেউ উন্নতি করেছে, কেউ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
সার্বিকভাবে, বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ না হলে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।