জ্বালানি সংকটে বাড়তে পারে সাপ্তাহিক ছুটি ও ফিরতে পারে অনলাইন ক্লাস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব সামাল দিতে দেশের জ্বালানি খাতে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ঘরে বসে কাজ বা হোম অফিস চালু করা, অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর মতো বিভিন্ন প্রস্তাব সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সব সরকারি সংস্থাকে নিজস্ব প্রস্তাবনা তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাব আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আপাতত তিন মাসের একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের চিন্তা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকেও যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে সরকার এই কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি বিবেচনা করছে। আলোচনায় থাকা পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে সপ্তাহে অতিরিক্ত একদিন ছুটি ঘোষণা অথবা সপ্তাহে দুই দিন কর্মকর্তাদের ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। এছাড়া অফিসের কাজ আগেভাগে শুরু করা কিংবা মোট কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহের একটি অংশ অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ঋণ পরিহার, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপসহ বিভিন্ন প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী নয়।
এ বিষয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদি পরিকল্পনাও নিতে হতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি মন্ত্রণালয় নিজেদের কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পরিকল্পনার খসড়া তৈরি শুরু করেছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার চাহিদা নিয়ন্ত্রণ কৌশল বা ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্টের দিকেও নজর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরণ নিয়ন্ত্রণ, কমানো বা নির্দিষ্ট সময়ে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, বিশেষ করে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকও ডাকা যেতে পারে। তিনি কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সময়কার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সরকারি অফিসগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা কঠোরভাবে মানার নির্দেশ দিয়েছে। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে দিনের বেলা প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা এবং ব্যবহার না হলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রতিটি অফিসে এসব নির্দেশনা তদারকির জন্য নজরদারি দল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করায় বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরবরাহ সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, পেট্রোবাংলা আগাম সতর্ক করেছে যে আগামী মাসগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সম্প্রতি কেনা এলএনজি সময়মতো দেশে পৌঁছালে এপ্রিল মাসে বড় ধরনের সমস্যা নাও হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার