বিশ্ব

ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ডের দুয়ার খুলল যে আইন- তা নিয়ে কেন এত আলোচনা

  • 3:11 pm - March 31, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩২ বার

মেলবোর্ন, ৩১ মার্চ- সাধারণ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত থাকার পরও ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের পর মাত্র দুইজন ব্যক্তি এই দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। দেশটিতে সবশেষ ফাঁসির ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ৬৩ বছর আগে। তারপর আর কোনো মৃত্যুদণ্ডের দৃষ্টান্ত নেই ইসরায়েলে। তবে দীর্ঘ বছর পর আবারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে চলেছে। গতকাল সোমবার এ সংক্রান্ত একটি আইন পাস করেছে নেসেট।

এদিন সংসদীয় কমিটি ‘দণ্ডবিধি বিল (সংশোধনী – সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড)’ এর চূড়ান্ত সংস্করণ অনুমোদন করার তা দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাঠের মাধ্যমে আইনে পরিণত হয়।

এখন এই আইনে ইসরায়েলের সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সহজ হবে। এরই মধ্যে যেসব ফিলিস্তিনি ইহুদিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করা হবে ধারণা করা হচ্ছে।

তীব্র প্রতিযোগীতার মুখে
নেসেটে বিলটি উত্থাপন করেন কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং তার দল ওৎজমা ইহুদিত। তবে তা বিরোধীদের তীব্র প্রতিযোগীতার মুখে পড়ে। এর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু-সহ ৬২ জন্য সদস্য ভোট দেন। বিলের বিপক্ষে ভোট পড়ে ৪৮টি। তবে একজন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, বিলের পক্ষে ছিলেন যারা, তারা নেসেটে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে দাবি করেন, নতুন আইন সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।

প্রেক্ষাপট ৭ অক্টোবরের হামলা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যখন ইহুদিদের সিমখাত তোরাহ উৎসব চলছিল, সেই সময় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস এবং আরও কয়েকটি জঙ্গি গোষ্ঠী ইসরায়েলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়। ওই হামলায় বিদেশি নাগরিকসহ ১২’শর বেশি মানুষ নিহত হয়। আহত হয় আরও সহস্রাধিক মানুষ। পাশাপাশি জিম্মি হিসেবে আরও কয়েক’শ মানুষকে গাজায় ধরে নিয়ে যায় হামাস।

৭ অক্টোবরের ওই হামলা ছিল ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর দেশটিতে প্রথম বড় আকারের আগ্রাসন। এই হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। তাতে ৬০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়। যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।

ওই হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দিতেই মূলত নতুন আইনটি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ফিলিস্তিনিরা।

আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ
বিলটির পাসের পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা অবিলম্বে ইসরায়েলকে এই ‘বৈষম্যমূলক মৃত্যুদণ্ড আইন’ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ সব পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই শুধুমাত্র পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগ করা হবে।’

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আইনটিকে ‘নৃশংসতা, বৈষম্য এবং মানবাধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ’ বলে বর্ণনা করেছে। এছাড়াও কাউন্সিল অব ইউরোপ মহাসচিব অ্যালেইন বারসেট নতুন আইন ‘মারাত্মক পশ্চাদগমন’ বলে অভিহিত করেছেন।

ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। ইতালি, আয়ারল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশও আইনটির বিরোধিতা করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে।

সেই দুই মৃত্যুদণ্ড
ইসরায়েলে ১৯৫৪ সালে সাধারণ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করা হয়। তবে সরাসরি ‍উল্লেখ না থাকলেও যুদ্ধাপরাধ, মানবতারবিরোধী অপরাধ কিংবা ইহুদি জাতির বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড অনুমোদিত ছিল। সে কারণেই এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে দুই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এদের একজন হলেন মেইর টোবিয়ানস্কি। যাকে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন  রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ফায়ারিং স্কোয়াড মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। যদিও পরে প্রমাণিত হয় তিনি নির্দোষ ছিলেন।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আরেক ব্যক্তি হলেন অ্যাডলফ আইখম্যান। তাকে ১৯৬২ সালের ১ জুন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ইসরায়েল সরকার। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পাশাপাশি ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং বহু ইহুদিকে হত্যার সাথে জড়িত একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যপদ নেওয়ার অভিযোগেও অভিযুক্ত হন অ্যাডলফ আইখম্যান।

মৃত্যুদণ্ড, পরে বাতিল
১৯৮৮ সালে জন ডেমজানজুক নামের এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ইসরায়েলের আদালত। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এই রায়ের বিরুদ্ধে জন ডেমজানজুক ১৯৯৩ সালে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন। আদালত তার মৃত্যুদণ্ড বাতিল ঘোষণা করে।

৯০ দিনের মধ্যে কার্যকর
নতুন এই আইন মূলত সেই সব ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে, যারা ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায়েছে। এই কারণে আইনটিকে একটি ‘ফাঁসির ফাঁদ’ হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে। দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো অপরাধীকে ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হবে বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমনকি আইনে সাধারণ ক্ষমার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। তবে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট চাইলে এই আইনটি পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টে এটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এরই মধ্যে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল’ জানিয়েছে, তারা এই আইনের বিরুদ্ধে আপিল করবে।

আগুনে ঘি
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধের কারণে যখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন  এই আইন পাস করে নতুন করে ঘি ঢেলেছে ইসরায়েলের ‘মৃত্যুদণ্ড আইন’। ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে প্রণীত এই আইন বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলবে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েলি পার্লামেন্টের এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে উত্তেজনাকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে দেবে।

‘আমরা ভয় পাই না’
আইন প্রত্যাহারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেছেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি।’

‘‘যারা আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন এবং হুমকি দিচ্ছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেই সব মানুষকে বলছি- আমরা ভয় পাই না, আমরা মাথা নত করব না।”

এই শাখার আরও খবর

ঈদুল গাদিরে দুই হাজারের বেশি বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দিলেন মোজতবা খামেনি

মেলবোর্ন,০৬জুন-ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল গাদির উপলক্ষে দুই হাজারের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা মওকুফ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। শুক্রবার ইরানের বিচার…

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

চার সীমান্ত দিয়ে পুশ–ইন চেষ্টা প্রতিহত করল বিজিবি ও স্থানীয়রা

মেলবোর্ন,০৬জুন-লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।…

ইসরায়েল ও ইরানের ওপর চটলেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ৫ জুন-  দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল এবং ইরান উভয়ের প্রতিই কড়া বার্তা দিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। তিনি একদিকে বেসামরিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au