ঢাকায় চালু হচ্ছে পরীক্ষামূলক ‘ফুয়েল পাস’
মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- জ্বালানির চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে এই পাস…
মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- দেশে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালে হামের টিকা পেয়েছে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। গত প্রায় এক দশকের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন কভারেজ হিসেবে উঠে এসেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে অনেক এলাকায় এই হার ৬০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে এবং সামনে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরগুলোতে হামের টিকাদান কভারেজ ছিল অনেক বেশি। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও টিকাদান কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০২৫ সালে এ হার নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও নীতিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

টিকাদান কর্মসূচী। ছবি : সংগৃহীত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের একাধিক দফা কর্মবিরতি টিকাদান কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক স্বাস্থ্য সহকারীর চাকরি চলে যায় এবং পরবর্তীতে সীমিত আকারে কিছু জেলায় নিয়োগ দেওয়া হলেও অধিকাংশ এলাকায় পদ শূন্য রয়ে গেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে টিকা পৌঁছানো, শিশুদের শনাক্ত করা এবং নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছে।
এ ছাড়া টিকা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, কভিড-পরবর্তী সময়ে টিকাদান ব্যবস্থায় যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই ‘মিসিং’ শিশুরা কয়েক বছর ধরে জমা হয়ে বড় ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ শিশুর জন্য এই টিকা প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ দেশে সর্বশেষ বড় আকারের হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। এরপর আর কোনো জাতীয় পর্যায়ের ক্যাম্পেইন না হওয়ায় টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কয়েক লাখ শিশু মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। একইভাবে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার মনে করেন, নীতিগত পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে দুর্বল করেছে। তিনি দ্রুত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ এবং আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং নতুন করে ১৬ জন ভর্তি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ছয় মাসের নিচে, অর্থাৎ তারা এখনও টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় টিকার বয়সসীমা কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।

হামের টিকা। ছবিঃ সংগৃহীত
একই সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটে মার্চ মাসেই ভর্তি হয়েছে ২৮৬ শিশু, বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ৭৭ জন। গত তিন মাসে সেখানে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেককে মেঝে, সিঁড়ি কিংবা পাশের ভবনে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। মাত্র দুইজন শিশু বিশেষজ্ঞ দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ছয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে সেখানে সাতজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং আরও অনেক সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলাতেও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নতুন আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ শিগগিরই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ এখন সবচেয়ে জরুরি। নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা, ঝরে পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকা দেওয়া, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তারা সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে হামের সংক্রমণ আরও বাড়বে এবং তা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au