বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: সার সংকটে চাপে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কৃষক

  • 8:02 pm - April 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭ বার
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সার সংকট, চাপে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকরা। ছবিঃ আল-জাজিরা

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বপন মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সার সংকট ও দামের ঊর্ধ্বগতি কৃষকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। দূরের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে তাদের মাঠ, আয় এবং পারিবারিক জীবনে।

ভারতের পাঞ্জাবের গুরদাসপুর অঞ্চলের ৪২ বছর বয়সী কৃষক রমেশ কুমার এ বছর ফসল নিয়ে হিসাব কষতে কষতেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। গমক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি একদিকে সার খরচ, সম্ভাব্য উৎপাদন আর বাজারদর নিয়ে ভাবছেন, অন্যদিকে মাথায় ঘুরছে সংসারের খরচ, ছেলের স্কুল ফি, ঋণের কিস্তি এবং মেয়ের বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা টাকার হিসাব।

তিনি বলেন, “এ বছর সব সামলাতে পারব কি না জানি না। সবকিছুই ফসলের ওপর নির্ভর করছে।” তাঁর এই অনিশ্চয়তা নতুন নয়, তবে এবার তা আরও গভীর হয়েছে। আগে যেখানে সার ছিল সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য, এখন তা দামে বেশি এবং সময়মতো পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “দাম যদি আরও বাড়ে, তাহলে কোথাও না কোথাও খরচ কমাতে হবে। হয়তো মেয়ের বিয়ে পিছিয়ে দিতে হবে, এমনকি ছেলের পড়াশোনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।”

এই পরিস্থিতি শুধু একজন কৃষকের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার লাখো কৃষকের বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে এই অঞ্চলের কৃষিতে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যা ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ওপর হামলার পর এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তরল প্রাকৃতিক গ্যাস মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এই পথেই এশিয়ায় আসে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সার আমদানি দেরি হয়, পরিবহন ও বিমার খরচ বাড়ে এবং বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি কৃষি উৎপাদনে, বাড়ে উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামও বেড়ে যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে সারনির্ভর কৃষির ওপর। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশে কৃষিখাতই বড় কর্মসংস্থানের উৎস। ভারতে প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ কৃষিতে নিয়োজিত, পাকিস্তানে প্রায় ৩৮ শতাংশ, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং নেপালে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।

এই দেশগুলো সার আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং এর বড় অংশই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ভারতে কৃষিখাতের মূল্য প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার এবং শত মিলিয়নের বেশি পরিবার এর ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রয়োজনীয় সার ও কাঁচামালের বড় অংশ আমদানি করতে হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়ে আসে।

পাকিস্তানে কৃষিখাত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ যোগান দেয়। দেশটির সার আমদানির প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে আসে। পাশাপাশি ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের দামও বেড়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। দেশের কৃষিখাত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র কৃষক আমদানিকৃত সারের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট সার আমদানির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে।সার

রংপুর অঞ্চলের কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, “কখনো সার পাওয়া যায়, কখনো পাওয়া যায় না। আর যখন পাওয়া যায়, তখন দাম বেশি থাকে।” একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে নেপালের কৃষকদের মধ্যেও। গুলমি জেলার কৃষক মেঘনাথ আরিয়াল বলেন, “সময়ে সার না এলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর দাম বেশি হলে আমরা কম ব্যবহার করতে বাধ্য হই।”

ভারত ও পাকিস্তানের সরকার কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে সরবরাহ আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে আস্থা কম। অনেকেই আগেভাগেই সার ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারের সামান্য ঘাটতিও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়বে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে বড় সংকট তৈরি করতে পারে, কারণ এখানে মানুষের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় হয়।

রমেশ কুমার ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ মৌসুমে তিনি কম সার ব্যবহার করবেন। যদিও তিনি জানেন এতে ফলন কমে যেতে পারে। তিনি বলেন, “এটা একটা ঝুঁকি, কিন্তু আর উপায় কী?”

ফসল কম হলে আয় কমবে, আর তখন সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, “স্কুল ফি তো দিতেই হবে, সংসারের খরচও থেমে থাকে না। আর মেয়ের বিয়ে… সেটা পরে দেখা যাবে।”

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একই ধরনের উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও দাম নিয়ে দুশ্চিন্তা, কোথাও সরবরাহ নিয়ে, আবার কোথাও সময়মতো সার না পাওয়ার আশঙ্কা।

শেষ পর্যন্ত, এই সংকট কৃষকদের জন্য শুধু একটি যুদ্ধের খবর নয়, বরং তাদের জীবিকা, পরিবার এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমেশ কুমারের কথায়, “অনেকের কাছে এটা যুদ্ধের বিষয়, কিন্তু আমাদের জন্য এটা হলো—আমরা পরিবার চালাতে পারব কি না।”

সূত্র: আল-জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

সংসদে বাদ পড়ছে গণভোটসহ অন্তর্বর্তী সরকারের ২০টি অধ্যাদেশ

মেলবোর্ন, ৩ এপ্রিল-  গণভোট, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে জাতীয় সংসদে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের…

বাংলাদেশে একদিনে ২৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার

মেলবোর্ন, ৩ এপ্রিল- সারাদেশে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে একদিনে আরও ২৫ হাজার ৫৩৭ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও…

আজ হনুমান জয়ন্তী: ভক্তি, শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার মহোৎসব

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- আজ ২ এপ্রিল সারা বিশ্বে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে হনুমান জয়ন্তী ২০২৬। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র,…

আজহারীকে অস্ট্রেলিয়া থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার: আর কখনো অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন না

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল: অস্ট্রেলিয়া সরকার মৌলবাদী ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তাকে স্থায়ীভাবে পুনরায় প্রবেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী…

ভবানীপুরে মনোনয়ন জমা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুরের আসনকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দিনভর রোড শো, বিক্ষোভ, পাল্টাপাল্টি স্লোগান এবং…

বাংলাদেশের সব দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- বাংলাদেশে সব দোকানপাট, বাণিজ্যবিতান এবং শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। জ্বালানি সংকটের কারণে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au