বাংলাদেশ

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে এত বিতর্ক কেন

  • 4:59 pm - April 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৪১ বার
মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ এপ্রিল- বাংলাদেশে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা। কিন্তু চলতি বছর শোভাযাত্রার নামকে ঘিরে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় রোববার ঘোষণা করেছে, এবার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

নাম পরিবর্তনের পটভূমি

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা উদযাপন শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের সময় থেকেই। প্রথমে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে ঢাকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন একত্র হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে পহেলা বৈশাখকে আরও বৃহৎ আকারে উদযাপন করতে শুরু করে। সেই সময় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

মঙ্গল শব্দের ব্যবহারকে ঘিরে অনেকদিন ধরেই বিতর্ক চলছিল। বিশেষ করে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে ধারণা ছিল, ‘মঙ্গল’ শব্দের মধ্যে হিন্দুধর্মীয় প্রভাব আছে। এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোভাযাত্রার নাম পুনরায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ রাখে। তবে হিন্দু সংগঠনগুলোর একাংশ দাবি জানায়, বিগত তিন দশকের ঐতিহ্য মেনে শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হওয়া উচিত।

সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী অবশ্য মন্তব্য করেছিলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করার কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে যেহেতু পরিবর্তন হয়ে গেছে, এবারও সেই নামের সঙ্গে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

হেফাজতে ইসলামীর প্রতিক্রিয়া

সংস্কৃতি মন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামী নামে এক উগ্র মৌলবাদী সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সংস্কৃতি মন্ত্রী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এই অবস্থায় যদি তিনি হিন্দুয়ানী চাপ দিয়ে নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করেন, তবে তা প্রতিরোধ করা হবে।

এদিকে বিএনপির সদ্য ক্ষমতায় আসা অবস্থায় হিন্দু সমাজ তাদের সমর্থন জানিয়েছিল। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

নতুন নাম: বৈশাখী শোভাযাত্রা

সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, নাম নিয়ে চলমান বিতর্কের অবসান ঘটাতে এবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পহেলা বৈশাখের যাবতীয় সুসজ্জিত মিছিলের নতুন নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। মন্ত্রী বলেন, “শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে। এখানে সমস্ত সাংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যেকোনো ধর্ম, সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের পোশাক, ঢোল-বাদ্য নিয়ে অংশ নিতে পারবে।”

মন্ত্রী আরও জানান, ‘বৈশাখী মেলা, বৈশাখী আনন্দ’—সবকিছুতে বৈশাখকে হাইলাইট করতে চাই। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির ব্যাপারেও কোনো সমস্যা নেই। তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে, এ দেশে এখন থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

সাংস্কৃতিক দিক ও ঐতিহ্য

বৈশাখী শোভাযাত্রার মূল চেতনা হলো নতুন বছরের আগমনে আনন্দ এবং মঙ্গল কামনা। তবে নামের কারণে বারবার টানাটানি চলেছে। ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু হয় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে। পরের বছর নাম পরিবর্তন হয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এই নাম পরিবর্তনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল একটি নাম নয়, বরং এটি বাঙালির সার্বজনীন ঐক্যের প্রতীক। ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করে নাম পরিবর্তনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

হাইকোর্টে রিট

পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের নির্দেশনার জন্য রোববার জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামলায় উল্লেখ করেন, শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈমান ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথে সংহতি রেখে করা উচিত।

রিটে বলা হয়েছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা মূলত নবসৃষ্ট কার্যক্রম, যা পহেলা বৈশাখের মূল সংস্কৃতির সঙ্গে কৌশলে যুক্ত করা হয়েছে। তাই নাম পরিবর্তন দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, জননিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

রিটে আরও বলা হয়েছে, রিটে বলা হয়েছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা ইসলামের কৌশলে পরিপন্থি। মুসলিমরা কেবল আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারে। তাই শোভাযাত্রার এই নাম ব্যবহার করা তাদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এতে সংস্কৃতি, ধর্ম ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা জেলা প্রশাসক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং চারুকলা অনুষদের ডিনকে বিবাদী করা হয়েছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী মিটিংয়ে বলেন, “শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রাখা। আনন্দ আর মঙ্গলের অর্থ সবাইকে বোঝাতে হবে। পহেলা বৈশাখে মানুষ আনন্দে ভেসে যায় এবং সেই আনন্দের মধ্যেই মঙ্গল খোঁজে।”

অধিকারকর্মী খুশি কবীর বলেন, “যারা বারবার পরিবর্তন করতে চায়, তারা জানে কেন। এটি অনিরাপত্তা থেকে তৈরি। বর্তমান সরকার ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এমনভাবে পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।”

জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এটি বৈচিত্র্যকে সম্মান করে, মৌলবাদকে নয়।”

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিবাদ

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ। তারা দাবি করেছে, সাংস্কৃতিক আয়োজন কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় চাপের কাছে নতজানু হতে পারে না।

তারা আরও জানিয়েছে, ‘মঙ্গল’ শব্দটি অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় এবং মানুষের মুক্তির প্রতীক। অপসারণ মানে সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল করা। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রা পুনর্বহালের জোর দাবি করেছে।

সরকারের ব্যাখ্যা

মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “ইউনেস্কোর স্বীকৃতি থাকলেও এটি বাধ্যতামূলক নয়। দেশীয় ঐতিহ্য বজায় রাখতে এবারের আয়োজনের নতুন নামকরণ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, উৎসবের মূল চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখেই নাম পরিবর্তন আনা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সব আয়োজনে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম ব্যবহার করা হবে।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নাগরিকরা নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রকাশের মাধ্যমে অংশ নিতে পারবে।

শোভাযাত্রার এই নতুন নাম দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা সাড়ে তিন দশক আগে ১৯৮৯ সালে শুরু হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়। নাম পরিবর্তন নিয়ে বারবার বিতর্ক চললেও মূল উদ্দীপনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা শুধুই আনন্দ উদযাপন নয়, এটি বাঙালির ঐক্য, কৃষক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন বছরের মঙ্গল কামনার প্রতীক।

সংস্কৃতি মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী এবার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। নাম পরিবর্তনের পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সকল বিতর্ক ও বিভাজন শেষ করার উদ্দেশ্যে।

এবারের শোভাযাত্রা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে, যা বাঙালির আনন্দ, মঙ্গল ও একতার প্রতীক হিসেবে দেশ ও বিদেশে পরিচিত হবে।

এই শাখার আরও খবর

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

চার সীমান্ত দিয়ে পুশ–ইন চেষ্টা প্রতিহত করল বিজিবি ও স্থানীয়রা

মেলবোর্ন,০৬জুন-লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।…

ইসরায়েলি রোগীদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগে দুই নার্সের বিচার ঘিরে নতুন বিতর্ক

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ব্যাংকসটাউন হাসপাতালের দুই নার্স সারা আবু লেবদেহ ও আহমদ রাশাদ নাদিরের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রোগীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বহুল আলোচিত মামলার…

আইএসআইএস-সম্পর্কিত নারী জেইনাব আহমদের জামিন শুনানিতে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য

মেলবোর্ন, ৫ জুন- আইএসআইএস-সম্পর্কিত দাসত্ব ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নারী জেইনাব আহমদের জামিন শুনানিতে তার চাচা আব্রাহাম আব্বাস সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএসকে ‘অশুভ’ বলে তীব্র…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au